নিজ ঘরেই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ নারী, বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতা
নিজ গৃহেই পারিবারিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন দেশের সিংহভাগ নারী। বিচারহীনতা ও আইনি প্রয়োগের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঝোপঝাড় আর কলাগাছের আড়ালে জংধরা একচালা-দোচালা একটি জোড়াতালি দেওয়া টিনের ঘর। প্রথম দর্শনে পরিত্যক্ত মনে হলেও টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের আগধল্যা গ্রামে এই জীর্ণ ঘরেই মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন দুই ভাই-বোন—শারীরিক প্রতিবন্ধী শফিকুল খলিফা (৪৭) ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ফাতেমা আক্তার (৩৯)। প্রতিবেশীদের সাহায্য-সহযোগিতা পেলে খাবার জোটে, নতুবা কাটাতে হয় চরম অনাহারে।
এলাকাবাসী জানান, একসময় এই পরিবারের অবস্থা এতটা শোচনীয় ছিল না। শফিকুলদের বাবা মুদিদোকানি রশিদ খলিফা প্রায় ২৫ বছর আগে স্ত্রী ও চার সন্তান রেখে মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর রিকশা চালিয়ে সংসারের হাল ধরেন শফিকুল। কিন্তু প্রায় ১০ বছর আগে হঠাৎ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে হাত-পা বেঁকে গেলে শফিকুলের স্বাভাবিক চলাফেরা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। অভাবের কারণে মেলেনি উপযুক্ত চিকিৎসাও।
পারিবারিক দুর্যোগের ধারাবাহিকতায় আট বছর আগে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে মারা যান মা মালেকা বেগম। মায়ের মৃত্যুর পরপরই চরম অভাবের তাড়নায় ছোট বোন সমতা আক্তার আত্মহত্যা করেন। অন্যদিকে বড় ভাই বিয়ে করে অন্য এলাকায় চলে যান। শেষ পর্যন্ত এই ভিটেবাড়িতে অবর্ণনীয় কষ্টে এক ছাদের নিচে থেকে যান পক্ষাঘাতগ্রস্ত শফিকুল ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বোন ফাতেমা।
শারীরিক অক্ষমতার কারণে ঘরে হামাগুড়ি দিয়ে কেবল দরজার মুখ পর্যন্ত আসতে পারেন শফিকুল। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া থেকে শুরু করে সমস্ত দৈনন্দিন কাজের জন্য তাঁকে বোন ফাতেমার ওপর নির্ভর করতে হয়। জীর্ণ টিনের ঘরটি ছাড়া তাঁদের কোনো নিজস্ব রান্নাঘর বা শৌচাগারও নেই।
প্রতিবেশী শাকিল খলিফা জানান, স্থানীয় গ্রামবাসী ও প্রবাসীদের উদ্যোগে ভাই-বোনের জন্য একটি আধা-পাকা ঘর, শৌচাগার ও রান্নাঘর নির্মাণের উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ টাকা সংগৃহীত হয়েছে। তবে বাড়িটির কাজ শেষ করতে এবং তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে আরও আনুমানিক চার লাখ টাকার প্রয়োজন।
বিষয়টি নজরে আনা হলে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
মির্জাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. ফরিদুল ইসলাম জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবন্ধী এই দুই ভাই-বোনের শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
মির্জাপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোবারক হোসেন জানিয়েছেন, সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় তাঁদের দ্রুত প্রতিবন্ধী ভাতার অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।