প্যারিসে ২০১৬ সালের সেই ডাকাতির ঘটনায় কিম কার্দাশিয়ানকে পেল মাএ ১ ইউরো ক্ষতিপূরণ
২০১৬ সালে প্যারিসে সশস্ত্র ডাকাতির শিকার হওয়ার ঘটনায় মার্কিন তারকা কিম কার্দাশিয়ানকে প্রতীকী ১ ইউরো ক্ষতিপূরণ দিয়েছে ফরাসি আদালত।
বিনোদন: ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস অঙ্গরাজ্যের টোপেকায় খুন হন কারেন হার্কনেস ও মাইক সিসকো। তদন্তের শুরু থেকেই সন্দেহের তির ছিল সিসকোর সাবেক স্ত্রী ডানা চ্যান্ডলারের দিকে। গ্রেপ্তার, তিন দফা বিচার এবং একাধিকবার দণ্ড—সবই হয়েছে। কিন্তু দুই দশক পরও প্রশ্ন থেকে গেছে, সত্যিই কি এই জোড়া খুনের রহস্যের সমাধান হয়েছে?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান চালিয়েছেন ইলিন ও কিন উমবের দম্পতি। তাঁদের অনুসন্ধান, সন্দেহ, আইনি লড়াই এবং সত্য খোঁজার দীর্ঘ যাত্রা নিয়ে তৈরি হয়েছে এইচবিওর তিন পর্বের তথ্যচিত্র ‘আ কিলার স্টোরি’। ১০ সেপ্টেম্বর থেকে প্রচার শুরু হয়েছে সিরিজটির। পরিচালনা করেছেন ম্যাথিউ গ্যালকিন।
২০১৭ সালে কানসাসের আলমা শহর থেকে সাংবাদিক জো সেক্সটনের কাছে একটি ই-মেইল আসে। প্রেরক ইলিন উমবের। ২০০২ সালের টোপেকার জোড়া খুনের ঘটনাটি নতুন করে অনুসন্ধান করতে তিনি সেক্সটনের আগ্রহ জানতে চেয়েছিলেন।
তখন মামলাটি সেক্সটনের কাছে প্রায় সমাধান হয়ে যাওয়া একটি ঘটনা। ২০০২ সালের ৭ জুলাই গভীর রাতে কারেন হার্কনেস ও তাঁর প্রেমিক মাইক সিসকোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তদন্তকারীদের ধারণা ছিল, হত্যার পেছনে ছিলেন সিসকোর সাবেক স্ত্রী ডানা চ্যান্ডলার। ২০১২ সালে চ্যান্ডলার দুটি প্রথম ডিগ্রির খুনে দোষী সাব্যস্ত হন।
তাই ইলিনের প্রস্তাবে শুরুতে আগ্রহ দেখাননি সেক্সটন। কিন্তু ইলিন থামেননি। কখনো এক সপ্তাহে ১০টি, আবার কখনো এক দিনেই ২৫টি ই-মেইল পাঠিয়েছেন তিনি। আদালতের নথি, ব্যালিস্টিকস রিপোর্ট, সম্পত্তির কাগজপত্রসহ নানা তথ্য পাঠাতে থাকেন।
একপর্যায়ে তাঁর পাঠানো ই-মেইলের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ৭১৪-তে। সেই সময় তিনি জানান, কানসাস সুপ্রিম কোর্ট চ্যান্ডলারের সাজা বাতিল করেছে। এবার সেক্সটনও মামলাটি নতুন করে দেখতে আগ্রহী হন।
২০০২ সালের ৭ জুলাই রাতে ক্যাসিনো থেকে টোপেকার টাউনহাউসে ফেরেন কারেন ও মাইক। পরে কারেনের বাবা তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করেন। দুজনকেই একাধিকবার গুলি করা হয়েছিল।
শুরুতেই ডাকাতির সম্ভাবনা নাকচ করে পুলিশ। ঘরে টাকা পড়ে ছিল, মাইকের মানিব্যাগে টাকাও ছিল এবং কারেনের গয়নাও অক্ষত ছিল। গুলির খোসায় আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়নি। উদ্ধার হয়নি হত্যার অস্ত্রও।
তবে গুলির খোসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়। সেগুলো ছিল ইসরায়েলি তৈরি সাবসনিক বুলেট, যা উজি ধরনের অস্ত্রে ব্যবহৃত হতে পারে। তদন্তকারী রে লানডিন ঘটনাটিকে ‘ওভারকিল’ হিসেবে দেখেছিলেন এবং এটি আবেগপ্রসূত হত্যাকাণ্ড হতে পারে বলে ধারণা করেছিলেন।
সিসকোর পরিবারের সন্দেহ ছিল চ্যান্ডলারের দিকে। তাঁদের ১৫ বছরের দাম্পত্য বিচ্ছেদ ছিল তিক্ত। চ্যান্ডলারের মদ্যপানের সমস্যার ইতিহাসও তদন্তে গুরুত্ব পায়।
তদন্তকারীরা জানতে পারেন, হত্যাকাণ্ডের আগে চ্যান্ডলার দুটি পাঁচ গ্যালনের গ্যাস ক্যান কিনেছিলেন। এতে ধারণা করা হয়, ডেনভার থেকে গাড়িতে টোপেকা গিয়ে আবার ফিরে আসা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল।
তবে চ্যান্ডলার হত্যার সময় টোপেকায় ছিলেন—এমন সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ কারণে শুরুতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেনি কর্তৃপক্ষ।
২০১১ সালে চ্যান্ডলারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের বছর প্রথম বিচারে মাত্র ৮৩ মিনিট আলোচনার পর জুরি তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে। দেওয়া হয় পরপর দুটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
তবে পরবর্তী সময়ে মামলায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু অসঙ্গতি সামনে আসে। চ্যান্ডলারের বিরুদ্ধে সিসকোর ‘প্রটেকশন ফ্রম অ্যাবিউজ’ আদেশ ছিল বলে প্রসিকিউশন দাবি করলেও কিন উমবের আদালতের নথি ঘেঁটে এমন কোনো আদেশের প্রমাণ পাননি।
২০১৮ সালের এপ্রিলে কানসাস সুপ্রিম কোর্ট চ্যান্ডলারের দুই সাজা বাতিল করে। আদালত অবশ্য জানায়, পারিপার্শ্বিক প্রমাণ নতুন বিচারের জন্য যথেষ্ট। ফলে তিনি মুক্তি পাননি এবং পুনর্বিচারের পথ খোলা থাকে।
চ্যান্ডলারের মামলায় প্রসিকিউশনের একজন আইনজীবীর বিরুদ্ধে পরে নৈতিক অভিযোগও করেন কিন উমবের। ২০২২ সালে কানসাস সুপ্রিম কোর্ট ওই আইনজীবীকে আইন পেশা থেকে বহিষ্কার করে।
চ্যান্ডলারকে নির্দোষ মনে করতেন ইলিন ও কিন উমবের। একই সঙ্গে তাঁরা বিশ্বাস করতেন, হত্যাকারী অন্য কেউ। তাঁদের সন্দেহ গিয়ে পড়ে কারেন হার্কনেসের জামাই জেফ সাটনের দিকে।
সাটনকে ঘিরে তাঁরা প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার একটি নথি তৈরি করেন। এতে তাঁর সহিংসতার ইতিহাস, টাউনহাউসে প্রবেশের সুযোগ এবং অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়সহ বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়।
মামলায় পাওয়া একটি চুল নিয়েও তাঁদের নিজস্ব তত্ত্ব ছিল। গুলির খোসায় পুড়ে লেগে থাকা চুলটি কারেন, মাইক বা চ্যান্ডলারের কারও ছিল না। উমবের দম্পতি ধারণা করেন, গুলি ছোড়ার সময় খোসাটি কোনো বাঁহাতি শুটারের হাতের ওপর দিয়ে গিয়ে চুলে লেগে থাকতে পারে।
সাটন বাঁহাতি কি না, তা খুঁজতে তাঁরা পুরোনো সংবাদপত্রের ছবিও পর্যালোচনা করেন। পরে সাটনের ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু পরীক্ষার ফল উমবের দম্পতির তত্ত্বকে সমর্থন করেনি; গুলির খোসায় পাওয়া চুলটি সাটনেরও ছিল না।
২০২২ সালে দ্বিতীয় বিচার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রসিকিউশন স্বীকার করে, মামলাটি ডিএনএ, চুল কিংবা আঙুলের ছাপের মতো প্রত্যক্ষ বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। চ্যান্ডলারের বিভিন্ন সময়ে দেওয়া আলিবিতেও অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়।
একপর্যায়ে এক প্রতিবেশী দাবি করেন, তিনি গুলির শব্দ শুনেছিলেন এবং চ্যান্ডলারের মতো দেখতে একজনকে দেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে ৯১১ কলের রেকর্ড এবং ক্যাসিনোর ভিডিওর সময়ের অসঙ্গতি পাওয়া যায়।
শেষ পর্যন্ত জুরি ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারায় দ্বিতীয় বিচার মিসট্রায়ালে শেষ হয়।
২০২৫ সালে তৃতীয়বার বিচার শুরু হলে চ্যান্ডলার তাঁর আইনজীবীদের সরিয়ে দিয়ে নিজেই নিজের পক্ষে মামলা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। আগের বিচারে তিনি সাক্ষ্য না দিলেও এবার কয়েক দিন ধরে নিজের জীবনের কথা আদালতে তুলে ধরেন। এমনকি রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে আসা নিজের সন্তানদেরও জেরা করেন।
চ্যান্ডলার দাবি করেন, হত্যার সময় তিনি টোপেকায় ছিলেন—এমন কোনো প্রমাণ নেই। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র তাঁর ছিল বা তিনি ৯ মিলিমিটারের কোনো অস্ত্র কিনেছিলেন—এমন প্রমাণও নেই বলে তিনি আদালতে যুক্তি দেন।
তবে জুরি তাঁর বক্তব্য গ্রহণ করেনি। আবারও তাঁকে দুই হত্যার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং পরপর দুটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
‘আ কিলার স্টোরি’ শুধু খুনি কে—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে না। বরং তথ্যচিত্রটি দেখাতে চায়, কোনো একটি ধারণায় মানুষ দীর্ঘদিন নিশ্চিত হয়ে গেলে সেই বিশ্বাস কীভাবে পরবর্তী প্রমাণের ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করতে পারে।
পরিচালক ম্যাথিউ গ্যালকিন দীর্ঘ সময় মামলাটি অনুসরণ করেও চ্যান্ডলারই খুনি কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি বলে তথ্যচিত্রে উঠে আসে। কারণ, মামলায় প্রত্যক্ষ শারীরিক প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ইলিন ও কিন উমবেরের অনুসন্ধানও শেষ পর্যন্ত চ্যান্ডলারের নির্দোষিতা বা অন্য কারও অপরাধ প্রমাণ করতে পারেনি। তাঁদের সন্দেহের ভিত্তিতে সাটনের ডিএনএ পরীক্ষা হলেও তা তাঁদের তত্ত্বকে সমর্থন করেনি।
ফলে দুই দশকের বেশি সময়, তিনটি বিচার এবং একাধিক রায়ের পরও এই মামলার সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। ‘আ কিলার স্টোরি’ সেই অসম্পূর্ণতার গল্পই সামনে আনে—যেখানে আদালতের রায় রয়েছে, কিন্তু সত্য নিয়ে বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।