স্বাস্থ্য

থাইরয়েড ক্যানসার,যে লক্ষণগুলো অবহেলা করা উচিত নয়

স্বাস্থ্য: প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে পালিত হয় থাইরয়েড ক্যানসার সচেতনতা মাস। অনেক ক্ষেত্রে এ রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে ঘাড়ে নতুন কোনো গুটি, ফোলা বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডির থাইরয়েড ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার খবরও এ রোগ নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়িয়েছে। রোগের ধরন ও বিস্তারের ওপর নির্ভর করে থাইরয়েডের একাংশ বা পুরো গ্রন্থি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হতে পারে। পুরো থাইরয়েড অপসারণের পর সাধারণত থাইরয়েড হরমোনের ওষুধ নিয়মিত সেবন করতে হয়।

থাইরয়েড গলার সামনের দিকে শ্বাসনালির কাছাকাছি অবস্থিত প্রজাপতির মতো আকৃতির একটি ছোট গ্রন্থি। এটি বিভিন্ন হরমোন তৈরি করে, যা শরীরের বিপাকক্রিয়া, হৃদস্পন্দন, শরীরের তাপমাত্রাসহ বিভিন্ন স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

থাইরয়েডের কোষ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সেখানে গুটি বা নডিউল তৈরি হতে পারে। তবে থাইরয়েডে গুটি পাওয়া গেলেই সেটি ক্যানসার—এমন নয়। বেশির ভাগ থাইরয়েড নডিউল ক্যানসারবিহীন।

থাইরয়েড ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ সৃষ্টি করে না। শারীরিক পরীক্ষার সময় কিংবা অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য করা আল্ট্রাসাউন্ড, সিটি স্ক্যান বা অন্যান্য পরীক্ষায় ঘটনাক্রমেও এটি ধরা পড়তে পারে।

রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

গলার সামনের দিকে গুটি বা ফোলা।

ঘাড়ের পাশে লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া।

দীর্ঘস্থায়ী কণ্ঠস্বর ভাঙা বা পরিবর্তন।

খাবার গিলতে সমস্যা।

শ্বাস নিতে সমস্যা।

ঘাড়ের সামনের দিকে ব্যথা, যা কখনো কানের দিকেও ছড়িয়ে যেতে পারে।

সর্দি-কাশির সঙ্গে সম্পর্কহীন দীর্ঘস্থায়ী কাশি।

তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই থাইরয়েড ক্যানসার হয়েছে—এমন নয়। অন্যান্য অনেক রোগেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই নতুন কোনো গুটি বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

যেকোনো বয়সে থাইরয়েড ক্যানসার হতে পারে। তবে নারীদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায় এবং ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সে এর প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। পরিবারের নিকটাত্মীয়ের থাইরয়েড ক্যানসারের ইতিহাস, কিছু বংশগত জেনেটিক রোগ এবং বিশেষ করে শৈশবে মাথা বা ঘাড়ে রেডিয়েশনের সংস্পর্শ ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তবে ঝুঁকির কোনো কারণ থাকলেই যে একজন ব্যক্তির থাইরয়েড ক্যানসার হবে, তা নয়। আবার অনেক রোগীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো ঝুঁকির কারণও পাওয়া যায় না।

চিকিৎসক ঘাড় পরীক্ষা করে থাইরয়েডে গুটি বা লিম্ফ নোডের অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে পারেন। প্রয়োজন হলে আল্ট্রাসাউন্ড, রক্ত পরীক্ষা এবং সূক্ষ্ম সূঁচের মাধ্যমে বায়োপসি করা হয়।

আল্ট্রাসাউন্ডে থাইরয়েডের গঠন ও গুটির বৈশিষ্ট্য দেখা হয়। রক্ত পরীক্ষায় থাইরয়েডের কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে থাইরয়েড ক্যানসার থাকলেও অনেক রোগীর থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকতে পারে।

ফাইন-নিডল অ্যাসপিরেশন বায়োপসিতে সূক্ষ্ম সূঁচ দিয়ে গুটি থেকে কোষ সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়। থাইরয়েডের কোনো গুটি ক্যানসারযুক্ত কি না নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এটি বহুল ব্যবহৃত পরীক্ষা।

থাইরয়েড ক্যানসারের ধরন, টিউমারের আকার, রোগটি কতটা ছড়িয়েছে এবং রোগীর অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার প্রধান চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ক্যানসারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী থাইরয়েডের একাংশ বা পুরো গ্রন্থি অপসারণ করা হতে পারে। পুরো থাইরয়েড অপসারণ করা হলে শরীরে প্রয়োজনীয় হরমোনের ঘাটতি পূরণে থাইরয়েড হরমোনের ওষুধ সেবন করতে হয়।

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর তেজস্ক্রিয় আয়োডিন চিকিৎসা দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট ধরনের জটিল বা অগ্রসর থাইরয়েড ক্যানসারে রেডিয়েশন থেরাপি, লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ বা অন্যান্য চিকিৎসাও প্রয়োজন হতে পারে।

থাইরয়েড ক্যানসারের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। প্যাপিলারি থাইরয়েড ক্যানসার সবচেয়ে সাধারণ ধরন এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে অনেক ক্ষেত্রেই সফলভাবে চিকিৎসা করা যায়। রোগের ধরন ও পর্যায়ের ওপর চিকিৎসার ফল নির্ভর করে।

চিকিৎসার পরও নিয়মিত ফলোআপ প্রয়োজন হতে পারে। রোগের ধরন ও চিকিৎসার ভিত্তিতে চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা বা প্রয়োজনীয় ইমেজিংয়ের মাধ্যমে রোগের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।

গলার বেশির ভাগ গুটি ক্যানসার নয়। তবু গলায় নতুন কোনো গুটি বা ফোলা দেখা দিলে, দীর্ঘদিন কণ্ঠস্বর পরিবর্তিত থাকলে, খাবার গিলতে বা শ্বাস নিতে সমস্যা হলে কিংবা ঘাড়ে অস্বাভাবিক ব্যথা বা ফোলা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

গড়পড়তা ঝুঁকির মানুষের জন্য সবার ক্ষেত্রে নিয়মিত থাইরয়েড ক্যানসার স্ক্রিনিং করার সুপারিশ নেই। তবে পারিবারিক ইতিহাস, শৈশবে মাথা-ঘাড়ে রেডিয়েশনের সংস্পর্শ বা নির্দিষ্ট বংশগত ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসক আলাদা পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিতে পারেন।

থাইরয়েড ক্যানসার অনেক সময় নীরবে শুরু হলেও ঘাড়ে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সুযোগ থাকে। তাই সন্দেহজনক কোনো লক্ষণ দেখা দিলে নিজে থেকে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Related News

হেপাটাইটিস বি ঠেকাতে টিকা কেন জরুরি, কারা নেবেন

হেপাটাইটিস বি থেকে সুরক্ষায় টিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ, নবজাতক ও প্রাপ্তবয়স্কদের কারা টিকা নেবেন, কত ডোজ প্রয়োজন এবং ডোজ বাদ পড়লে কী করবেন—জেনে নিন।

সারাদিন ক্লান্তি-ঝিমুনি? এক চামচ কালো তিল হতে পারে খাদ্যতালিকার উপকারী সংযোজন

কালো তিলে রয়েছে আয়রন, কপার, ম্যাগনেশিয়াম ও বি ভিটামিনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান। পুষ্টিবিদের পরামর্শে কীভাবে খাবেন এবং কারা সতর্ক থাকবেন জেনে নিন।

হাম-রুবেলার টিকাদানে সাফল্য: লক্ষ্য ছাড়াল ১০%, ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন ক্যাম্পেইন

সারাদেশে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশু হাম-রুবেলার টিকা নিয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে আবার শুরু হচ্ছে দেশব্যাপী নতুন টিকা ক্যাম্পেইন।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রূপান্তর হচ্ছে শ্যামলীর টিবি হাসপাতাল: ববি হাজ্জাজ

২৫০ শয্যার শ্যামলী টিবি হাসপাতাল হচ্ছে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ ইনস্টিটিউট। ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট নতুন ভবন নির্মাণ ও শূন্যপদ পূরণের ঘোষণা দিলেন ববি হাজ্জাজ।

প্রস্রাব চেপে রাখার মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি: ব্লাডার ও কিডনির স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা

দীর্ঘ সময় প্রস্রাব আটকে রাখলে ব্লাডারের মাংসপেশির স্থায়ী ক্ষতি ও ইউরিনারি সিস্টেমের নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। জেনে নিন স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

হামের সংক্রমণ আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে দ্বিতীয় দফার বিশেষ টিকাদান: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

হামের সংক্রমণ মোকাবিলায় আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে দ্বিতীয় দফায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

চিকিৎসার পরও কেন ফিরে আসে পাইলসের সমস্যা?

পাইলসের সফল চিকিৎসার পরও কেন একই সমস্যা বারবার ফিরে আসে? কোষ্ঠকাঠিন্য, ভুল খাদ্যাভ্যাস ও টয়লেটের খারাপ অভ্যাসসহ এর পেছনের প্রধান কারণগুলো জেনে নিন।

সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা, মাঠে নামছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়

সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে অক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এ এম এ মুহিত।

Search