রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে আয়োজিত দ্বাদশ সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল ইউনাইটেড কালচারস ফোরামে বাংলাদেশ ও রাশিয়ান ফেডারেশনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর কেবল দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পর্ককে গভীরতর করে না, বরং বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুদৃঢ় করে।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের এই ঐতিহাসিক অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের হাজার বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, শিল্পকলা ও লোকজ সংস্কৃতিকে মেলে ধরার অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে।
সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বিশ্বরাজনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে নরম শক্তি বা ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে কাজ করে। ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে ঐতিহাসিক সহযোগিতার শিকড় অত্যন্ত গভীরে।
দ্বিপাক্ষিক এই সমঝোতার মাধ্যমে ঐতিহ্য সংরক্ষণ, আধুনিক শিল্পকলা, জাদুঘর ব্যবস্থাপনা, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এবং সৃজনশীল উদ্যোগগুলোতে যে যৌথ অগ্রযাত্রার অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা আগামী দিনে দুই দেশের সার্বিক সম্পর্ক পরিচালনায় এক বড় অনুঘটক হবে।
সেন্ট পিটার্সবার্গ ফোরামের সুবাদে কেবল রাশিয়ার সাথেই নয়, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথেও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পুনর্নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ফোরাম চলাকালীন মিয়ানমারের ধর্ম ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী ইউ টিন ও লুইন-এর সাথে বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বৌদ্ধ ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং হাজার বছরের অভিন্ন ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে সাংস্কৃতিক সংলাপ দুদেশের মধ্যকার বিরাজমান অন্যান্য সংকট নিরসনে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের লোকজ উৎসব (যেমন বাংলা নববর্ষ), পাহাড় ও সমতলের বৈচিত্র্যময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা এবং বাংলা সংগীতের ঐতিহ্য বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা আন্তর্জাতিক পর্যটন ও সাংস্কৃতিক গবেষণাকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
ফোরামের নির্ধারিত অধিবেশনে ‘Folk Artisan Craftwork Rebooted’ বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রীর মূল বক্তব্য প্রদান বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কারুশিল্পের জন্য এক নতুন আশার বার্তা।
বাংলাদেশের মৃৎশিল্প, জামদানি, নকশী কাঁথা এবং পাটজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে লোকশিল্পের বৈজ্ঞানিক পুনর্জাগরণ ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে কৌশল ভাগাভাগি করলে দেশীয় কারুশিল্পীরা সরাসরি লাভবান হবেন।
ফোরামের প্লেনারি সেশনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপস্থিতি ও বক্তব্য বহু মেরুর বিশ্বে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক ঐক্যের গুরুত্ব নির্দেশ করে।
রাজনৈতিক বা সামরিক সম্পর্কের চেয়ে সাংস্কৃতিক বিনিময় মানুষের সাথে মানুষের বন্ধনকে হাজার গুণ মজবুত করে। ২৪-২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই বৈশ্বিক সম্মেলন থেকে বাংলাদেশ যে কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অর্জন নিয়ে ফিরবে, তা যথাযথ নীতিমালার মাধ্যমে ধরে রাখা প্রয়োজন।
রাশিয়ার সাথে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারক কেবল চুক্তির কাগজেই যেন সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং নিয়মিত শিল্পী বিনিময়, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে এটিকে এক জীবন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিষ্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।