মিরপুরে ভাঙচুর হওয়া রাড্ডা সেন্টারের ভাঙা কক্ষেই শুরু হলো স্বাস্থ্যসেবা
হামলার শিকার মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ভাঙা কক্ষেই টিকাদান ও স্বাস্থ্যসেবা শুরু হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ ও পানির অভাবে চরম ভোগান্তিতে শিশু ও মায়েরা।
স্বাস্থ্য: ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ সংসারের টুকিটাকি জিনিস কিনেছিলেন দুজন মিলে। খিলগাঁওয়ে আঁচল রায়ের মা–বাবার বাসার পাশেই ভাড়া নিয়েছিলেন একটি ছোট্ট বাসা। ধীরে ধীরে ঘরটি গুছিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বরিশালে গিয়ে নতুন করে সংসার সাজানোর রঙিন স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক দম্পতি বিপ্লব চন্দ্র দাস ও আঁচল রায়ের। কিন্তু প্রমত্ত ডেঙ্গু জ্বর সেই সাজানো সংসার আর গোছানোর সুযোগ দিল না। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন মেধাবী চিকিৎসক আঁচল রায়।
গত বছরের ১৮ এপ্রিল ঢাকায় ঘটা করে বিয়ে হয় বিপ্লব ও আঁচলের। এর তিন দিন পর বরিশালে হয় বউভাত। স্বামী-স্ত্রী দুজনই চিকিৎসক হওয়ায় চাকরি, দায়িত্ব আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুজনেরই ব্যস্ততা ছিল প্রবল। বিয়ের পর চাকরির কারণে কসবা, জামালপুর, ঢাকা ও বরগুনায় আলাদা শহরে থাকতে হয়েছে তাঁদের। ছুটির দিনে কিংবা ঢাকায় কাজের সুবাদে দেখা হলেই চলত সংসারের হিসাব—কী কিনবেন, কোথায় থাকবেন, কবে একসঙ্গে থাকবেন।
৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিপ্লব সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর তাঁদের পরিকল্পনা আরও পোক্ত হয়েছিল। ঠিক হয়েছিল, বরিশালে বিপ্লবের বাড়ির এলাকায় পোস্টিং নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করবেন এবং সন্তান নেওয়ার কথা ভাববেন। খিলগাঁওয়ের ভাড়া বাসায় কেনা কিছু জিনিসপত্র আর ভবিষ্যতের সেই পরিকল্পনাগুলো এখন কেবলই স্মৃতি।
গত ২১ সেপ্টেম্বর আঁচলের জ্বর আসে। জ্বর নিয়েই সেদিন স্বামী-স্ত্রী দুজনে পূজার কেনাকাটা করেছিলেন। ল্যাব থেকে লোক এনে পরীক্ষা করালে তাঁর প্লাটিলেট পাওয়া যায় এক লাখ, মুখে খাবারও খেতে পারছিলেন। বিপ্লব হাসপাতালে ভর্তির তাগিদ দিলেও আঁচল রাজি হননি। কিন্তু দ্রুত কমতে থাকা প্লাটিলেট ২৫ হাজারে নেমে গেলে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেদিন বিপ্লব একটি কাজে ছিলেন বরিশালে।
হাসপাতালে ভর্তির পর দ্রুত অবনতি ঘটে আঁচলের শারীরিক অবস্থার। এইচডিইউ, আইসিইউ পেরিয়ে একের পর এক জটিল চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। স্বামী ও চিকিৎসক হিসেবে বিপ্লবও আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন প্রিয়তমা স্ত্রীকে বাঁচাতে। এমনকি মনের সান্ত্বনার জন্য নিজেই সিবিআই (জরুরি জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা পদ্ধতি) দিয়েছিলেন। আইসিইউর বাইরে থেকে বারবার সাহস জুগিয়ে বলছিলেন, “তুমি ফাইটার, তুমি ফিরবে।” কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে গত ২৭ সেপ্টেম্বর চিরতরে বিদায় নেন আঁচল।
নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের পঞ্চম ব্যাচের শিক্ষার্থী বিপ্লব ও সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আঁচলের পরিচয় থেকে প্রেম এবং পরিশেষে পরিণয়। পড়াশোনাকে ধ্যানজ্ঞান মানা আঁচল ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর এমআরসিপি পার্ট ওয়ান পাস করেছিলেন এবং মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
আঁচলের মৃত্যুর পর তাঁর একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন বিপ্লব, যে ছবিটি নিয়ে বেঁচে থাকতে একটু অভিমানও করেছিলেন আঁচল। ছবি তোলার সেই মুহূর্তটি আর বাস্তবে ভাগ করে নেওয়া হয়নি। এছাড়া বেঁচে থাকার সময় আঁচল মাঝেমধ্যে মজা করে বলতেন, তিনি আগে মারা গেলে যেন তাঁর সমাধিতে সাদা ফুল নিয়ে যাওয়া হয়। স্ত্রীর সেই কথাটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে সমাধিতে সাদা গোলাপ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন শোকাহত স্বামী বিপ্লব।
যে দুজন মানুষ একসঙ্গে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন, আজ তাদের একজনের কপালে জুটেছে কেবল শূন্যতা, আর অন্যজনের সামনে পড়ে আছে সেই অসমাপ্ত সংসার, কেনা জিনিসপত্র আর কিছু অমলিন স্মৃতি।