প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা ফেনীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সফর কেবল একটি প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; বরং তা ছিল আত্মিক সম্পর্ক, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিকাশ এবং এলাকার মানুষের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের এক অনন্য রূপক। নিজের নানাবাড়ি ফুলগাজীর মাটি ও মানুষের উদ্দেশে আবেগঘন কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রীর উচ্চারণ—“মা তো নেই, এখন আপনাদেরই উচিত আমাকে দেখে রাখা… আপনারা কি আমাকে দেখে রাখবেন?”—তৃণমূলের সাধারণ নাগরিকদের সাথে রাষ্ট্রপ্রধানের সম্পর্কের নিবিড় সেতু গড়ে তুলেছে।
রাজধানী থেকে সড়কপথে সকালে রওনা হয়ে দিনব্যাপী ফেনী, পরশুরাম ও ফুলগাজীর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং জনগণের সাথে সরাসরি মতবিনিময় কর্মসূচি পরিচালনা দেশের সুশাসন ও আঞ্চলিক সুষম উন্নয়নের রূপরেখাকে দৃশ্যমান করে তোলে।
ফুলগাজী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভাটির অন্যতম প্রধান দিক ছিল সাধারণ কৃষক ও ধর্মীয় সেবকদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কল্যাণ ব্যবস্থার গোড়াপত্তন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর জেলায় ৫,৬৪৩ জন প্রান্তিক কৃষককে ‘কৃষক কার্ড’-এর আওতায় নিয়ে আসা এবং সুবিধাভোগীদের মাঝে সরাসরি কার্ড হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, সেবায়েত ও পুরোহিতদের হাতে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা তুলে দেওয়ার পদক্ষেপটি সমাজে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার এক মাইলফলক। ফুলগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি আঞ্চলিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি সুনিশ্চিত করবে।
ফেনীর এই সফরের অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক অর্জন ছিল ১,৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যানিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ কাজের শুভ উদ্বোধন।
পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় বারবার ক্ষতিগ্রস্ত পরশুরাম ও ফুলগাজী এলাকার কৃষি সুরক্ষায় এই বিপুল অঙ্কের মেগা প্রকল্প স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তা অটুট রাখতে কার্যকর হাতিয়ার হবে। ডেকবাংলোয় ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও পরশুরামের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ-ব্যবস্থা সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগটি সরকারের পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিদ্যুৎ খাতের প্রতি অঙ্গীকার তুলে ধরে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর উন্নয়ন ও আবেগের এক অসাধারণ সমন্বয়। ফেনীবাসীর কাছে পরিবার ও নানাবাড়ির আবেগ তুলে ধরার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে যেসব বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেছেন, তা সরকারের জবাবদিহিতা ও সুশাসনের চর্চাকে বেগবান করবে।
শীর্ষ নেতৃত্ব যখন সরাসরি তৃণমূলের সমস্যা শুনে সমাধানের পথ প্রস্তুত করে, তখন তা জাতীয় অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে—এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার মূল শক্তি।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।