স্বাধীন ও স্বকীয় গণমাধ্যম একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য ফুসফুসের মতো কাজ করে। যদি গণমাধ্যমের শ্বাস রুদ্ধ করা হয়, তবে গোটা রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা ও সুশাসন পঙ্গু হতে বাধ্য। বাংলাদেশে বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার এবং সেটিকে তোষামোদি বা প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত করার যে অপচেষ্টা দেখা গেছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য একটি স্বাধীন ‘গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের।
এই প্রেক্ষাপটে, রাজধানীর গুলশানের একটি সেমিনারে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের বক্তব্য দেশের সংবাদ মাধ্যমের অংশীজনদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই উদ্যোগ কেবলই সদিচ্ছার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ, নাকি সত্যিই এক স্বাধীন মুক্ত গণমাধ্যমের সুবর্ণ তোরণ—তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
একটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় কলাম হিসেবে এর বিভিন্ন দিক ও কাঠামোগত প্রভাব নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে ইতিবাচক এবং প্রশংসনীয় দিক হলো—তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, গণমাধ্যম কমিশন গঠনে সরকার নিজের পক্ষ থেকে কোনো একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবে না। অতীতে আমরা দেখেছি, যেকোনো কমিশন বা আইন তৈরির ক্ষেত্রে সরকারগুলো নিজেদের একটি পূর্ব-নির্ধারিত এজেন্ডা বা খসড়া সামনে রাখত, আর অংশীজনদের সাথে আলোচনা হতো কেবলই লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। বর্তমান তথ্যমন্ত্রী যখন ঘোষণা করেন যে আলোচনা, প্রস্তাবনা এবং অতীত ডকুমেন্টকে ধারণ করেই সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হবে, তখন একে নীতিগত স্তরে ‘গণতান্ত্রিক এবং অংশগ্রহণমূলক’ মনে হয়। এটি সংস্কার প্রক্রিয়ার শুরুতেই অংশীজনদের মাঝে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক আস্থার জায়গা তৈরি করে।
সংবাদপত্রের মালিক সমিতি (নোয়াব) এবং সম্পাদক পরিষদের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দের সাথে সরকার প্রধানের ফলপ্রসূ আলোচনা এবং পরবর্তীতে একটি ‘পরামর্শ কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। এর পাশাপাশি তথ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে, অতীতের কোনো ভালো উদ্যোগ বা নথিপত্রকে বাদ দেওয়া হবে না, বরং সবটুকুই ভবিষ্যৎ কাজের মূল ভিত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর অর্থ হলো, সরকার চাকা নতুন করে আবিষ্কার করতে চাচ্ছে না, বরং পূর্ববর্তী বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যম সংস্কারের জন্য যে খসড়া বা ভালো প্রস্তাবগুলো জমা পড়েছিল, সেগুলোকে কাজে লাগাতে চায়। পরামর্শ কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর আবারও সব অ্যাসোসিয়েশন ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে বসার প্রতিশ্রুতি মূলত একটি সমন্বিত আইনি কাঠামো তৈরিতে সাহায্য করবে।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন একটি চমৎকার দার্শনিক সত্য উচ্চারণ করেছেন যে, গণমাধ্যম জগৎটা কেবল সরকারের একার নয়, এটি সবার এক সম্মিলিত বিষয়। তাঁর মতে, সরকার এখানে কোনো ‘নিয়ন্ত্রক’ বা ‘মালিক’ নয়, বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাজটা সম্পন্ন করার জন্য একটি ‘ব্যবস্থাপকের’ দায়িত্ব পালন করবে মাত্র। আধুনিক গণতান্ত্রিক সভ্যতায় গণমাধ্যমকে যখন রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন সরকারের এই ‘সহযাত্রী’ ও ‘ব্যবস্থাপক’ হওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত প্রগতিশীল।
তবে প্রশ্ন জাগে বাস্তবায়ন নিয়ে। বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ক্ষমতার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যেখানে সরকার বা রাষ্ট্র যেকোনো স্বাধীন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চায়। কমিশন গঠিত হলেই কি সাংবাদিকেরা স্বাধীনভাবে লিখতে পারবেন? নাকি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কোনো নতুন খোলসে প্রেসক্রিপশন আসবে? এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার যেমন বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন বা ইউকে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এবং স্থানীয় ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি)-র মতো বিশেষায়িত সংগঠনগুলোর পরামর্শকে সরকার কতটা অক্ষরে অক্ষরে মানবে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই কমিশনের ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা।
কমিশন কতটুকু স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারবে?
তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী যদি পুরো প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়িত হয়, তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অনেকটাই নিশ্চিত হওয়ার কথা। কারণ:
- ১. নীতিগত ধারাবাহিকতা: পূর্বের কাজকে ভিত্তি ধরায় কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর একক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।
- ২. আন্তর্জাতিক মানদণ্ড: ব্রিটিশ হাইকমিশনার বা বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম কমিশনের যে সব চমৎকার দৃষ্টান্ত রয়েছে, সেগুলোকে অনুসরণের ঘোষণা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জনে সাহায্য করবে।
- ৩. আদান-প্রদানের সংস্কৃতি: সংবাদকক্ষের কর্মপদ্ধতি থেকে নীতি সংস্কার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা আনার যে উদ্যোগ সেমিনারে আলোচিত হয়েছে, তা হলুদ সাংবাদিকতা বন্ধ এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা বিধানে সাহায্য করবে।
বলা যায়, ‘মৌখিক সদিচ্ছা’ এবং ‘বাস্তব স্বাধীনতার’ মধ্যে একটি বড় ধরনের ব্যবধান সব সময়ই থাকে। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের উপস্থিতিতে যে রূপরেখার কথা বলা হয়েছে, তা নীতিগতভাবে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এবং এর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা সম্ভব। কিন্তু কাগজের এই সুন্দর রূপরেখাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকারকে অবশ্যই তাঁর ‘ব্যবস্থাপক’ চরিত্রের ওপর অটল থাকতে হবে।
কমিশনের কোনো আইনি ধারায় যেন গোপনে কোনো নিয়ন্ত্রণের ধারা বা সেন্সরশিপের ফাঁদ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা আশা করব, সরকার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে এবং কোনো একক সিদ্ধান্ত না চাপিয়ে সত্যিই অংশীজনদের মালিকানায় এমন একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন উপহার দেবে, যা জনগণের জন্য তথ্যের একটি সুস্থ, অবাধ ও নিরাপদ প্রবাহ নিশ্চিত করবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।