হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং প্রতিরোধযোগ্য ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত শিশুদের আক্রান্ত করে। এক সময় বাংলাদেশ হাম ও রুবেলা নির্মূলের কাছাকাছি পৌঁছালেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে টিকাদানের ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শৈথিল্য এবং করোনা মহামারী-উত্তর সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) বিঘ্নিত হওয়ায় রোগটি আবার রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশুদের আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুর গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হওয়া আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও প্রতিরোধ কাঠামোর জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য বুলেটিন ও মাঠ পর্যায়ের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সরকারি ও বেসরকারি হিসাব মতে, গত এক বছরে সারা দেশে হাম ও রুবেলায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প, কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল এবং ঢাকার বড় বড় বস্তি এলাকাগুলোকে ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
হাম সাধারণত প্রাণঘাতী না হলেও, সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়া এবং অপুষ্টিজনিত কারণে এই ভাইরাসের ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ (Encephalitis) হয়ে শিশু মৃত্যুর হার বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধেই সারা দেশে হাম ও জটিলতার কারণে প্রায় দেড় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার বর্তমানে প্রায় ১.২% থেকে ১.৫%, যা উন্নত বা আদর্শ ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সী এবং তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এই মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
হামের জটিলতায় আক্রান্ত শিশুদের আইসিইউ (ICU) বা বিশেষায়িত পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডের প্রয়োজন হয়। এমনিতেই দেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট রয়েছে, তার ওপর হামের রোগীর আধিক্য চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে আরও ভঙ্গুর করে তুলছে।
হামের কারণে যেসব শিশু অন্ধত্ব, শ্রবণশক্তিহীনতা বা স্থায়ী মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছে, তারা দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরোধযোগ্য শিশু মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্য বাংলাদেশের রয়েছে, হামের এই প্রাদুর্ভাব সেই বৈশ্বিক সূচকে দেশের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
হাম প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার হলো এমআর (MR) ভ্যাকসিন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং ভাসমান জনগোষ্ঠীর মাঝে ভ্যাকসিনের প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ বা আওতা ৯০%-এর নিচে নেমে এসেছে, যেখানে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৯৫% কভারেজ থাকা বাধ্যতামূলক।
গ্রামীণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুদের মাঝে ভিটামিন ‘এ’ এবং সুষম খাদ্যের অভাব হামের তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া গ্রামীণ এলাকায় অনেক পরিবার এখনও হাম হলে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে কবিরাজি বা ঝাড়ফুঁকের ওপর ভরসা করে, যা শিশুর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে।
হামের এই মহামারী সদৃশ পরিস্থিতি থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত এবং যুদ্ধকালীন তৎপরতা চালানো প্রয়োজন:
১. ক্র্যাশ প্রোগ্রাম ও ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন: দেশের যে সমস্ত জেলা বা অঞ্চলে হামের প্রকোপ বেশি, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে ‘ক্যাচ-আপ টিকাদান ক্যাম্পেইন’ পরিচালনা করতে হবে। বাদ পড়া ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী প্রতিটি শিশুকে দ্রুত এমআর ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হবে।
২. দুর্গম অঞ্চলে বিশেষ নজরদারি: পার্বত্য অঞ্চল, চর, চা বাগান এবং উপকূলীয় এলাকার মতো ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলের জন্য ভ্রাম্যমাণ টিকাদান টিম (Mobile Vaccination Teams) গঠন করতে হবে।
৩. ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ: হাম আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা ও মৃত্যুহার কমাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী দ্রুত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে। এটি চোখের ক্ষতি ও নিউমোনিয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
৪. ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি: গণমাধ্যম, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। “হাম কোনো সাধারণ বা অবহেলার ছোঁয়াচে রোগ নয়, এটি একটি মারাত্মক ব্যাধি এবং এর একমাত্র প্রতিকার সঠিক সময়ে টিকা নেওয়া”—এই বার্তাটি প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।
৫. তদারকি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা: ইপিআই (EPI) কর্মসূচির কোনো স্তরে গাফিলতি বা ভ্যাকসিনের কোল্ড চেইন (Cold Chain) বজায় রাখার ক্ষেত্রে অবহেলা হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
হামের মতো একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগের কারণে ২০২৬ সালে এসেও দেশের শত শত শিশুর অকালমৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন দেশের স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন হাম-রুবেলা নির্মূলের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সঠিক পরিকল্পনা, ভ্যাকসিনের সুষম বণ্টন এবং মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশকে আবারও হামমুক্ত এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ করা সম্ভব।