সম্পাদকীয়

র‍্যাবের জন্য নতুন আইন ও পুনর্গঠনের উদ্যোগ: মানবাধিকার রক্ষা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ঘোষণা

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মূল দায়িত্ব নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া এবং মানবাধিকার সমুন্নত রাখা। কিন্তু বাংলাদেশে বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে যেভাবে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদারিত্ব সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে র‍্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ঘোষণা—র‍্যাবের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে এবং একে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত করে মানবাধিকারের মানদণ্ডে পুনর্গঠন করা হবে—তা একটি স্বস্তিদায়ক এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

২০০৪ সালে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ঐক্যজোট সরকারের আমলে দেশের চরমপন্থী, সর্বহারা, শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং জেএমবিসহ উগ্রবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর দমনকল্পে একটি বিশেষায়িত বাহিনী বা ‘এলিট ফোর্স’ হিসেবে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) গঠন করা হয়েছিল। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য আধা-সামরিক বাহিনীর চৌকস সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এই বাহিনীটি কমান্ডো ধাঁচের আভিযানিক সক্ষমতার কারণে দ্রুতই দেশের মানুষের কাছে অপরাধ দমনের একটি আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে।

প্রাথমিক বছরগুলোতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থী সন্ত্রাস দমন, জলদস্যু মুক্তকরণ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে র‍্যাব অসামান্য সাফল্য দেখায়। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে র‍্যাবের গ্রহণযোগ্যতা রাতারাতি বৃদ্ধি পায়।

র‍্যাবের এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়টি কালিমালিপ্ত হতে শুরু করে বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ শাসনামলে। শেখ হাসিনার একদলীয় শাসনব্যবস্থা চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে এই এলিট ফোর্সকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা শুরু হয়।

অপরাধ দমনের আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’-এর নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং স্বাধীন কণ্ঠস্বরগুলোকে স্তব্ধ করতে মধ্যযুগীয় কায়দায় ‘গুমের’ ভয়াবহ সংস্কৃতি চালু করা হয়। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীসহ শত শত রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে তুলে নিয়ে গুম করার পেছনে এই বাহিনীর কিছু বিপথগামী শীর্ষ কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।

রাষ্ট্রীয় মদদে মানবাধিকারের এই চরম লঙ্ঘনের ফলশ্রুতিতে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‍্যাব এবং এর সাতজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এটি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ঠিকই বলেছেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এমন কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছিল না যা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। গুটিকয়েক উচ্চাভিলাষী ও চামচামির নীতিতে বিশ্বাসী কর্মকর্তার কারণে পুরো বাহিনীটি বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের খোলনলচে বদলে ফেলা অপরিহার্য। র‍্যাবের মতো একটি সংবেদনশীল বাহিনীর ক্ষেত্রে তা আরও বেশি প্রযোজ্য।

অতীতে র‍্যাব মূলত একটি সরকারি নির্বাহী আদেশে পরিচালিত হতো, যার কারণে এর ভেতরের জবাবদিহিতার অভাব ছিল। বর্তমান সরকার যে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তার মাধ্যমে এই বাহিনীর ক্ষমতা ও কাজের পরিধি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে আসবে।

নতুন এলিট ফোর্সের প্রতিটি অভিযানের মূল ভিত্তি হতে হবে মানবাধিকার। যেকোনো নাগরিককে আটক বা জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের পূর্ণ প্রতিফলন থাকতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, নতুন আইন এবং নতুন নামে যদি এই এলিট ফোর্সকে পুনর্গঠন করা যায়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তাদের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার পথ খুঁজবে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পেতে এই সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।

বিগতইলিয়াস আলীসহ বিগত সময়ে সংঘটিত সব গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT)-এর অধীনে সম্পন্ন করার যে ঘোষণা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়েছেন, তা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি। অপরাধী যেই হোক, বাহিনীর পোশাক পরে পার পাওয়ার দিন যে শেষ—এই বার্তাটি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই উক্তিটিই প্রমাণ করে যে বর্তমান সরকার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে কতটা সংকল্পবদ্ধ। র‍্যাব বা সমমানের যেকোনো এলিট ফোর্সের প্রয়োজন একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সন্ত্রাস দমনের জন্য অনস্বীকার্য। তবে তা যেন কখনোই নাগরিকদের ভয়ের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। নতুন আইনি কাঠামো এবং মানবাধিকারের মূলমন্ত্রকে ধারণ করে এই বাহিনীর পুনর্গঠন সফল হলে, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অন্যতম সেরা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

লেখক: রোটারিয়ান এম, নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Related News

দৈনিক শব্দমিছিলের সিনিয়র রিপোর্টার মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন ৪৭ সদস্যের কাফেলাসহ ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে

পবিত্র ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন দৈনিক শব্দমিছিলের সিনিয়র রিপোর্টার মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন। ৪৭ সদস্যের কাফেলা আগামী ১৭ অক্টোবর দেশে ফিরবে।

কারাগারে নির্যাতনের গুজব ও বাস্তবতা: স্পিকারের বক্তব্যই সত্য- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

কারাবন্দি সাবেক এমপিদের নির্যাতনের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে স্পিকারের বক্তব্যকে সত্য হিসেবে তুলে ধরলেন রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

গ্রেফতার, প্রতিবাদ ও আগামীর বাংলাদেশ- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

মেজর আখতারুজ্জামানের গ্রেফতার, জামায়াতের মিছিল ও বিমানমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে জাতীয় রাজনীতির বিশ্লেষণ তুলে ধরলেন রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

সংলাপ ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা – রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রীর আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশ্লেষণধর্মী কলাম।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ফেনী সফর; উন্নয়ন, আবেগ ও সুশাসনের চিত্র : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সফর, কৃষক কার্ড বিতরণ, মহুরী সেচ প্রকল্প ও ১০০ শয্যার হাসপাতাল ঘোষণা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

জননিরাপত্তা, রাজনৈতিক শৃঙ্খলার পরীক্ষা ও সরকারের দায়বদ্ধতা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, সরকারের বিব্রতবোধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ বেঁধে দেওয়া ঠিক হবে না : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন, এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার বিধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্থায়ী রূপরেখা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

খেলাপি ঋণের পাহাড় ও ব্যাংকিং খাতের সংকট: কাগজের শিথিলতা নয়, চাই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি

বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ও সংকটাপন্ন ঋণের সর্বশেষ চিত্র, কাঠামোগত ত্রুটি এবং ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনে চার দফা জরুরি সুপারিশ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search