খেলা

মেক্সিকোর ৯৬ বছরের অভিশাপ মোচন: তিন লাল কার্ডের বিশ্বরেকর্ড ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা বিধ্বস্ত

হুলিয়ান কিনিয়োনেসের গোলের পর মেক্সিকোর উদ্‌যাপন

ফুটবল মহাকাব্যে কিছু কিছু মাঠের নিজস্ব একটা আধ্যাত্মিক শক্তি থাকে। মেক্সিকোর ঐতিহাসিক ‘আজতেকা স্টেডিয়াম’ ঠিক তেমনই এক পুণ্যভূমি, যেখানে বিশ্বকাপের ম্যাচে মেক্সিকো কখনো হারেনি। তবে মেক্সিকানদের সামনে জেঁকে বসেছিল ৯৬ বছরের এক পুরোনো ভূত—বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের অভিশাপ! ১৯৩০ সালের প্রথম আসর থেকে শুরু করে এর আগে সাত-সাতবার উদ্বোধনী ম্যাচ খেলেও মেক্সিকো কখনো জয়ের মুখ দেখেনি। কিন্তু ঘরের মাঠে ৮৩ হাজার দর্শকের অবিরাম ‘মেক্সিকান ওয়েভ’, রাউল হিমিনেজদের অনবদ্য ফুটবল এবং হুলিয়ান কিনিয়োনেসের রেকর্ড গড়া বুট অবশেষে সেই অপয়া ইতিহাসকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকো পেল তাদের ইতিহাসের প্রথম জয়। তবে এই জয় কেবল গোলের জন্য নয়, বরং বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তিনটি লাল কার্ডের এক নজিরবিহীন নাটকীয়তার জন্য চিরকাল ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে থাকবে।

ম্যাচ শুরুর আগে জমজমাট উদ্বোধনী অনুষ্ঠান গ্যালারিতে যে আনন্দের পারদ চড়িয়েছিল, তা মাঠে রূপ নিতে সময় লেগেছে মাত্র ৮ মিনিট ৩২ সেকেন্ড। স্বাগতিক ফরোয়ার্ড হুলিয়ান কিনিয়োনেসের বক্সের ভেতর থেকে নেওয়া শট দক্ষিণ আফ্রিকান গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামসের দুই পায়ের ফাঁক গলে যখন জালে জড়ায়, তখন আজতেকা স্টেডিয়ামের গর্জন যেন মেক্সিকো সিটির আকাশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মেক্সিকান ফুটবলার উদ্বোধনী গোল করার গৌরব অর্জন করলেন। শুধু তা-ই নয়, ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলের সিজার সাম্পাইও (৫ মিনিট) এবং ২০০৬ সালে জার্মানির ফিলিপ লামের (৬ মিনিট) পর এটি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের ইতিহাসে তৃতীয় দ্রুততম গোল হিসেবে রেকর্ডবুক ওলটপালট করে দেয়।

খেলার দ্বিতীয়ার্ধ ছিল মূলত কার্ড এবং আবেগের কোলাজ। ৫০ মিনিটে বক্সের মাথায় মেক্সিকান খেলোয়াড়কে ফাউল করে দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডার স্ফেফেলো সিথোলে প্রথম লাল কার্ড দেখলে ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়তে শুরু করে ‘বাফানা বাফানা’রা। ম্যাচের ৬৬ মিনিটে ফুটবল বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত—মাঠে নামেন মেক্সিকোর বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়, মাত্র ১৭ বছর ২৪০ দিন বয়সী বিস্ময়বালক গিলবার্তো মোরা।

ঠিক তার পরের মিনিটেই (৬৭ মিনিট) আসে সেই মহাকাব্যিক ক্ষণ। ডান প্রান্ত থেকে আলভারাদোর নিখুঁত পাস থেকে মাপা হেডে বল জালে জড়ান মেক্সিকোর ৩৫ বছর বয়সী অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড রাউল হিমিনেজ। গোল করার পর মাঠে হিমিনেজের সেই আনন্দাশ্রু আর গ্যালারিতে সবুজ জার্সি পরা দর্শকদের আবেগঘন কান্না প্রমাণ করছিল—ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, এটি জীবনের চেয়েও বড় কিছু। এক প্রান্তে ১৭ বছরের তরুণের অভিষেক, অন্য প্রান্তে ৩৫ বছরের অভিজ্ঞের গোল ও অশ্রু—মেক্সিকান ফুটবলের দুই প্রজন্মের এই মেলবন্ধন ছিল অনন্য।

এই ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসে গোল বা ফুটওয়ার্কের চেয়েও বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবে রেফারির পকেট থেকে ঘন ঘন বের হওয়া লাল কার্ডের জন্য। নিচে ম্যাচের কার্ডের পরিসংখ্যানটি তুলে ধরা হলো:

সময় (মিনিট) খেলোয়াড় ও দল কার্ডের ধরন ম্যাচের ওপর প্রভাব
৫০ মিনিট স্ফেফেলো সিথোলে (দক্ষিণ আফ্রিকা) সরাসরি লাল কার্ড ১০ জনের দলে পরিণত হয় দক্ষিণ আফ্রিকা, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারায়।
৮৪ মিনিট থেম্বা জেওয়ানে (দক্ষিণ আফ্রিকা) সরাসরি লাল কার্ড ৯ জনের দলে পরিণত হয়ে ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে যায় তারা।
৯২ মিনিট সেজার মন্তেস (মেক্সিকো) সরাসরি লাল কার্ড যোগ করা সময়ে মেক্সিকোর জয়ের উদযাপনে কিছুটা ধাক্কা লাগে।

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের ইতিহাসে এর আগে কখনো এক ম্যাচে তিনটি লাল কার্ড দেখার রেকর্ড নেই। দক্ষিণ আফ্রিকা শেষ পর্যন্ত ৯ জনের দলে পরিণত হয়ে মাঠ ছাড়ে এবং ১৬ বছর আগে (২০১০ বিশ্বকাপে) স্বাগতিক হিসেবে মেক্সিকোকে ১-১ গোলে আটকে দেওয়ার মধুর প্রতিশোধ এবার টের পায় হারের তীব্র বেদনায়।

যোগ করা সময়ে মেক্সিকোর সেন্টার ব্যাক সেজার মন্তেসের লাল কার্ড স্বাগতিকদের আনন্দে কিছুটা ভাঁটা ফেললেও, শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথে আজতেকা মেতে ওঠে এক শতাব্দীর সেরা উদযাপনে। ৯৬ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর মেক্সিকো তাদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু করল বুক চিতিয়ে, অভিশাপ ভেঙে এক বীরোচিত জয়ের মাধ্যমে। এই জয় মেক্সিকানদের আত্মবিশ্বাসকে নিয়ে গেছে এক নতুন উচ্চতায়।

 

Related News

বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের নতুন সহ-সভাপতি রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান: ‘দৈনিক শব্দমিছিল’ পরিবারের উষ্ণ অভিনন্দন

বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশনের নতুন সহ-সভাপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিশিষ্ট ক্রীড়াসংগঠক রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান। তাকে দৈনিক শব্দমিছিল পরিবারের পক্ষ থেকে অভিনন্দন।

মেটলাইফে লাল রক্তের জয়গান: মেসিকে কাঁদিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন

অতিরিক্ত সময়ের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে আবারও বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে বসলো স্পেন। ফেরান তোরেসের করা জয়সূচক এক লক্ষ্যভেদে ২০১০ সালের পর নিজেদের দ্বিতীয়…

মেসিকে টপকে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা এমবাপ্পে

বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মিয়ামি স্টেডিয়ামে গোলবন্যার এক রোমাঞ্চকর লড়াই দেখল ফুটবলবিশ্ব। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ৬-৪ গোলে হারিয়ে ব্রোঞ্জ পদক নিজেদের করে নিয়েছে থমাস…

বিশ্বকাপ ফাইনালের গ্যালারিতে থাকছে স্পেনের রাজপরিবার

চলতি বিশ্বকাপের ট্রফি নির্ধারণী ম্যাচকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। আগামী রোববার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শিরোপার চূড়ান্ত লড়াইয়ে মাঠে নামবে…

জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে সিরিজে ফিরল বাংলাদেশ

বুলাওয়েতে ঘুরে দাঁড়াল বাংলাদেশ দল। অলরাউন্ড নৈপুণ্যে জিম্বাবুয়েকে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে ৩৪ রানে হারিয়ে সিরিজে সমতা এনেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। প্রথম ম্যাচে হেরে পিছিয়ে পড়া…

বিশ্বকাপ ফাইনালে লড়াই এবার ‘গুরু-শিষ্যের’

ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল মানেই শ্রেষ্ঠত্ব আর ইতিহাস গড়ার তুমুল লড়াই। তবে এবারের আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মহাদ্বৈরথে যোগ হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবেগ। স্পেনের ডাগআউটে দাঁড়ানো…

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের মহাকাব্যিক সমীকরণ: স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা | দৈনিক শব্দমিছিল

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সম্পূর্ণ নকআউট ব্র্যাকেটের বিশেষ বিশ্লেষণ। মিশর, সুইজারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার রোমাঞ্চকর গল্প নিয়ে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের কলাম।

ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা | দৈনিক শব্দমিছিল

সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন। মেসি, এনজো ও লাউতারোর জাদুতে ফাইনালের টিকিট কাটল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

Search