সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা এবং অবৈতনিক পড়াশোনা নিশ্চিত করা একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বরাবরই সুবিধাবঞ্চিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার প্রধান আশ্রয়স্থল। কিন্তু গত ১৩ জুন (শনিবার) রাজধানীর বেইলি রোডে আয়োজিত এক জাতীয় সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. সাখাওয়াত হোসেন সরকারি প্রাথমিকে শ্রেণিভেদে সুনির্দিষ্ট ‘পরীক্ষা ফি’ চালুর যে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন, তা শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে সচেতন অভিভাবক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শিক্ষকদের ব্যক্তিগত পকেটের আর্থিক চাপ কমাতে সরকারি এই সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে যৌক্তিক মনে হলেও, এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক দর্শনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
নতুন নিয়ম: কোন শ্রেণিতে কত ফি?
মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, আপাতত প্রাথমিকের ৩টি শ্রেণির জন্য পরীক্ষার খাতা, প্রশ্নপত্র মুদ্রণ ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে এই ফি নির্ধারণ করা হয়েছে:
-
তৃতীয় শ্রেণি (Class 3): প্রতি পরীক্ষার জন্য ফি ৩০ টাকা।
-
চতুর্থ শ্রেণি (Class 4): প্রতি পরীক্ষার জন্য ফি ৪০ টাকা।
-
পঞ্চম শ্রেণি (Class 5): প্রতি পরীক্ষার জন্য ফি ৫০ টাকা।
সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি: শিক্ষকদের পকেটের টান বনাম প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা
হঠাৎ করে সরকারি স্কুলে কেন এই ফি নির্ধারণ করা হলো, তার পেছনে গণশিক্ষা সচিব যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা মাঠপর্যায়ের স্কুলগুলোর একটি রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে আনে। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে যে সরকারি ‘স্লিপ বরাদ্দ’ (School Slip Allocation) দেওয়া হয়, তা দিয়ে একটি পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ খরচ—যেমন কাগজ কেনা, প্রশ্ন টাইপ ও ফটোকপি করা এবং আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটানো প্রধান শিক্ষকদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক ছিল যে, অনেক স্কুলে শিক্ষকদের নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিয়ে পরীক্ষার আয়োজন করতে হতো। একজন শিক্ষকের ওপর এমন ব্যক্তিগত আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। সচিবের ভাষায়, “দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর চেয়েও অনেক বেশি হারে পরীক্ষা ফি নেওয়ার উদাহরণ রয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ না দিয়ে পরীক্ষার মতো জরুরি একটি কার্যক্রম সুচারুভাবে পরিচালনা করা।”
বাজেট ঘাটতি ও অভিভাবকদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা
অর্থনৈতিক ও শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ৩০ বা ৫০ টাকা হয়তো শহুরে মধ্যবিত্তের জন্য বড় কোনো অংক নয়, কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের বা চরাঞ্চলের একজন দিনমজুরের সন্তানের জন্য এই সামান্য টাকাও পরীক্ষার টেবিলে বসার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। নিচে এই নতুন নিয়মের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| নতুন নিয়মের ইতিবাচক দিক |
তৈরি হওয়া সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও শঙ্কা |
| * শিক্ষকদের ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক চাপ দূর হবে। |
* ‘বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা’র রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার আংশিক ক্ষুণ্ণ হবে। |
| * প্রশ্নপত্র ও খাতার মান উন্নত এবং পরীক্ষা সময়মতো সম্পন্ন হবে। |
* প্রান্তিক ও অতি-দরিদ্র পরিবারের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে। |
| * সরকারি স্লিপ বরাদ্দের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে না। |
* এই সুযোগে কিছু অসাধু বিদ্যালয় অতিরিক্ত টাকা আদায়ের সুযোগ নিতে পারে। |
ভবিষ্যতের আশার আলো: বাজেট বৃদ্ধি ও পুনর্বিবেচনার আশ্বাস
তবে এই নির্দেশনার মাঝে অভিভাবকদের জন্য একটি আশার আলোও দেখিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব। তিনি স্বীকার করেছেন যে, বর্তমানে সরকারি স্লিপের বরাদ্দ কিছুটা সীমিত হওয়ার কারণেই সাময়িকভাবে শিক্ষার্থীদের পকেট থেকে এই ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সুখের বিষয় হলো, সরকার ইতিমধ্যেই আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য বরাদ্দ বা ফান্ডের পরিমাণ বাড়িয়েছে।
আগামী অর্থবছর থেকেই বিদ্যালয়গুলো যখন আগের চেয়ে তুলনামূলক বেশি অর্থ পাবে, তখন এই ফি সংক্রান্ত নিয়মটি সরকার পুনরায় বিবেচনা বা প্রত্যাহার করতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করব, নতুন বাজেট ছাড় হওয়ার সাথে সাথেই যেন এই ফি প্রথা বিলুপ্ত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সংস্কারমুখী সরকার যখন দেশের ডিগ্রি পর্যন্ত নারী শিক্ষাকে অবৈতনিক করার মতো বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তখন প্রাথমিক স্তরে পরীক্ষা ফি চালুর সিদ্ধান্তটি কিছুটা হলেও বেমানান শোনায়। শিক্ষকদের আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনই দেশের হতদরিদ্র শিশুদের শিক্ষাজীবন যেন ৫০ টাকার অভাবে থমকে না যায়, তা নিশ্চিত করাও মন্ত্রণালয়ের কর্তব্য। আমরা আশা করব, স্থানীয় প্রশাসন ও প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা কঠোর নজরদারি রাখবেন যেন এই নির্ধারিত ফি-র বাইরে কোনো স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের হয়রানি করতে না পারে।