সম্পাদকীয়

৩৮ জেলায় নেই আইসিইউ: দেশের ক্রিটিক্যাল কেয়ার সংকটের ভয়াবহ চিত্র ও জরুরি স্বাস্থ্য সংস্কারের তাগিদ

একটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মেরুদণ্ড কতটা শক্তিশালী, তা প্রমাণিত হয় জরুরি ও সংকটাপন্ন মুহূর্তে নাগরিকদের জীবন বাঁচানোর সক্ষমতা বা ক্রিটিক্যাল কেয়ার (নিবিড় পরিচর্যাসেবা) ব্যবস্থার ওপর। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ নিবিড় পরিচর্যাসেবার যে চালচিত্র সম্প্রতি উঠে এসেছে, তা কেবল আশঙ্কাজনকই নয়, বরং চরম উদ্বেগজনক।

গত বুধবার (১ জুলাই, ২০২৬) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের (বিএসসিসিএম) জাতীয় সম্মেলন ২০২৬–এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি ও বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডা. জুবাইদা রহমান দেশের আইসিইউ সংকটের এক নির্মম ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন।

তাঁর উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড বা শয্যা রয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭টি এবং সাধারণ শয্যা রয়েছে মাত্র ৯টি। তার চেয়েও বড় আশঙ্কার কথা হলো, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৮টি জেলাতেই কোনো ধরনের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা আইসিইউ নেই। দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই বিশাল শূন্যতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক অধিকার ‘চিকিৎসা’ পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ভৌগোলিক বৈষম্যের অবসান ঘটাতে ডা. জুবাইদা রহমানের সময়োপযোগী পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশসমূহকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশের ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ যেখানে প্রত্যন্ত গ্রামে বাস করেন, সেখানে দেশের মোট ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। এই চরম বৈষম্যের কারণে প্রতিদিন ঢাকার বাইরের প্রান্তিক অঞ্চলের হাজার হাজার নবজাতক, অন্তঃসত্ত্বা মা, নিউমোনিয়া বা স্ট্রোকে আক্রান্ত বয়োবৃদ্ধ এবং সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সাধারণ মানুষ ন্যূনতম আইসিইউ বা নিবিড় পরিচর্যাসেবা না পেয়ে অকালেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন।

ডা. জুবাইদা রহমান যথার্থই বলেছেন, এই সংকটের গভীরতা কেবল শয্যার সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে দক্ষ মানবসম্পদ ও বিশেষায়িত সরঞ্জামের তীব্র অভাব। দেশের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত আইসিইউ অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি অ্যানেসথেটিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট ও নিউরোলজিস্টের মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং নিবিড় পরিচর্যায় প্রশিক্ষিত নার্স গড়ে তোলা না গেলে শুধু শয্যা বাড়িয়ে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না।

পাহাড়ি ও দূরবর্তী প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য ডা. জুবাইদা রহমান উন্নত ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত অ্যাম্বুলেন্স সেবার ওপর যে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন, তা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী। ভৌগোলিক দূরত্ব এবং যাতায়াত ব্যবস্থার প্রতিকূলতার কারণে গ্রামীণ জনপদে তাৎক্ষণিকভাবে আইসিইউ স্থাপন করা সময়সাপেক্ষ হলেও, আইসিইউ-সুবিধাযুক্ত কার্ডিয়াক অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে একজন মুমূর্ষু রোগীকে নিরাপদে নিকটস্থ জেলা সদরে স্থানান্তর করা সম্ভব।

এ জন্য দেশের প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এটি করা সম্ভব হলে ঢাকামুখী রোগীর উপচে পড়া ভিড় যেমন কমবে, তেমনি পথিমধ্যে বিনাচিকিৎসায় প্রাণ হারানোর হারও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

আমাদের দেশের চিকিৎসকেরা পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থার অভাব থাকা সত্ত্বেও দিনরাত যে অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিষ্ঠার মাধ্যমে রোগীদের জীবন বাঁচিয়ে রাখছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু ব্যক্তিকেন্দ্রিক এই প্রচেষ্টা দিয়ে একটি টেকসই স্বাস্থ্য কাঠামো গড়ে তোলা অসম্ভব।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উচিত বিএসসিসিএম-এর এই জাতীয় সম্মেলন থেকে উঠে আসা সংকটগুলোকে আমলে নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ক্র্যাশ প্রোগ্রাম বা মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা। ডা. জুবাইদা রহমানের বক্তব্যের মূল সুর ধরে আমরাও বলতে চাই—যথাযথ চিকিৎসা ও আইসিইউ সেবার অভাবে একটি অকাল মৃত্যু যেন কোনো পরিবারকে চিরতরে সর্বস্বান্ত বা নিঃস্ব না করে।

সমন্বিত সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ এবং সুষম বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি প্রান্তে ক্রিটিক্যাল কেয়ার সেবা পৌঁছে দেওয়াই হোক এই মুহূর্তের প্রধান জাতীয় অঙ্গীকার।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট রোডম্যাপ ২০৩০ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনা, সরকারি দলের ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’ এবং বিরোধী দলের প্রস্তাবিত যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি ও উত্তরণের পথ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দেশীয় সার কারখানায় গ্যাস-সংকট, বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে করণীয় সম্পর্কে বিশদ বিশ্লেষণমূলক সম্পাদকীয়।

জীবনকালীন ভোগাধিকার আইন ও সামাজিক বাস্তবতার ভারসাম্য : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

পিতা-মাতার ভোগাধিকার রক্ষা করে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন পাস এবং শরিয়াহ বিষয়ক বিতর্কের বিষয়ে উভয়পক্ষের নিরপেক্ষ মূল্যায়নধর্মী বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দূরদর্শী পরিকল্পনা ও জাতীয় আস্থার গুরুত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য ও জ্বালানি সংকট সমাধানের মহাপরিকল্পনার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি সংকটে শত শত গাড়ির লংমার্চ বিরোধী দলের রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

এনসিপি ও ১১-দলীয় ঐক্যের চার বিভাগীয় লংমার্চের যৌক্তিকতা এবং চলমান জ্বালানি সংকটে সম্পদ সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বৈচিত্র্যময় শিল্প, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও কৌশলগত অর্থায়নের নতুন পথরেখা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়নে আইএসডিবির অর্থায়ন চুক্তির ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল খেলাপি ঋণ; ব্যাংকিং খাতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনের তথ্য মতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংক খাতের সংকট, অনিয়ম ও সমাধানের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনে দূরীকরণে প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে আগস্টে ২৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার। আইন প্রয়োগ ও সুরক্ষার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search