সম্পাদকীয়

জুলাইয়ের চেতনার সুরক্ষা ও ফ্যাসিবাদের বিচার: বিভাজন ও ব্যবসা পরিহারের রাজনীতিই হোক ভবিষ্যৎ পথরেখা

সম্পাদকীয় ডেস্ক: একটি রক্তক্ষয়ী ও ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যখন কোনো ফ্যাসিস্ট শক্তির পতন ঘটে, তখন সেই নতুন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুটি অগ্রাধিকার থাকে—বিগত স্বৈরাচারের নৃশংসতার আইনি বিচার নিশ্চিত করা এবং অভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক বিকৃতি ও ফায়দা লোটার বৃত্ত থেকে সুরক্ষিত রাখা। চব্বিশের রক্তস্নাত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘জুলাই ’২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ ও ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’র যৌথ উদ্যোগে গত শনিবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’টি এই দুই বিষয়ের ওপরই এক গভীর আলোকপাত করেছে।

সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দেশের সমসাময়িক রাজনীতি, ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের বিচার প্রক্রিয়া এবং অভ্যুত্থানের নেপথ্য সমন্বয়ের যে বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী চিত্র তুলে ধরেছেন, তা জনমানসে এক নতুন চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে।

বিশেষ করে, গণ-অভ্যুত্থানের মহান স্মৃতি ও শহীদদের রক্তকে পুঁজি করে যারা নতুন করে ‘চেতনা বিক্রির ব্যবসা’ বা রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার অপচেষ্টা করছে, তাদের প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ।

বিগত দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনামলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার এই দেশের বুকে যে নজিরবিহীন গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ চালিয়েছে, তার কোনো রকম অনুশোচনা বা দোষ স্বীকারের সংস্কৃতি দলটির ইতিহাসে নেই—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই পর্যবেক্ষণ শতভাগ বাস্তবসম্মত।

দেশ থেকে বিতাড়িত ও দিল্লির মাটিতে রাজনৈতিকভাবে দাফন হয়ে যাওয়া এই নিষিদ্ধ শক্তিটি আজ প্রবাসে বসে এই ঐতিহাসিক গণবিস্ফোরণকে ‘জঙ্গি তকমা’ দেওয়ার যে নির্লজ্জ অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তা ধৃষ্টতার শামিল। তবে আশার কথা হলো, শুধু ব্যক্তি শেখ হাসিনা বা তার দোসরদের নয়, বরং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে গণহত্যার দায়ে একটি রাজনৈতিক দলকে বিচারের মুখোমুখি করার আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ, সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনীর মাধ্যমে খুব শীঘ্রই আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। সম্প্রতি স্বৈরাচারের অন্যতম দোসর জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের সাজার রায়ের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষের আপিলের সিদ্ধান্ত এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের আইনি তাগিদ প্রমাণ করে যে, অপরাধীদের ছাড় না দেওয়ার প্রশ্নে এই সরকার আপসহীন।

জাতীয় এই সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রাজনৈতিক ইতিহাসের পর্দার আড়ালের কিছু সত্য অবমুক্ত করেছেন, যা এতদিন একদলীয় প্রচারণার আড়ালে চাপা পড়েছিল। নির্বাসনে থেকেও বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে কীভাবে ২৪ ঘণ্টা সমন্বয় সাধন করে, দলীয় নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করে অরাজনৈতিক আন্দোলনের প্রারম্ভিক স্তরকে একটি চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়েছিল, তা আজ ইতিহাসের অংশ।

১৬ জুলাইয়ের পূর্বেই যখন মূলধারার ছাত্রনেতৃত্বের একাংশ কেবল ‘কোটাবৈষম্য দূর করার’ অর্থনৈতিক দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চেয়েছিল, তখন স্বৈরাচারকে গদিতে রেখে যে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র সম্ভব নয়—এই রাজনৈতিক দর্শন ও ‘দফা এক দাবি এক, স্বৈরাচারের পদত্যাগ’ স্লোগানের নৈতিক ও কৌশলগত জোগান এসেছিল বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেই।

ফলে আন্দোলনের মাঠপর্যায়ে যদি শহীদ ও আহতদের রাজনৈতিক পরিসংখ্যান করা হয়, তবে ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের আত্মত্যাগই যে সর্ববৃহৎ অংশ জুড়ে থাকবে, তা ‘সাদাকে সাদা’ বলার এক অনিবার্য ঐতিহাসিক সত্য।

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে মূল্যবান অংশটি ছিল—জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন ও ব্যবসার অপসংস্কৃতি বন্ধের আহ্বান। অতীতে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পবিত্র চেতনাকে যেভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিবার ও দল এককভাবে কুক্ষিগত করে বাণিজ্যিকীকরণ ও ফ্যাসিবাদের হাতিয়ার বানিয়েছিল, তার পরিণতি আমরা দেখেছি।

সেই চেতনা বিক্রির ব্যবসা করতে করতেই আজ তারা দেশছাড়া হয়ে দিল্লিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এই নতুন বাংলাদেশে জুলাইয়ের শহীদদের রক্ত নিয়ে যেন আর কোনো ‘নতুন চেতনার ব্যবসা’ বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীগত সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার পবিত্র দায়িত্ব। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার নবনির্বাচিত জনকল্যাণমুখী বাজেটের বাস্তবায়ন এবং দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য এই মুহূর্তে দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য প্রয়োজন।

আমরা আশা করি, জুলাইয়ের যোদ্ধারা কোনো ধরনের কৃত্রিম বিভাজনের ফাঁদে পা না দিয়ে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই দূরদর্শী রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট রোডম্যাপ ২০৩০ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনা, সরকারি দলের ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’ এবং বিরোধী দলের প্রস্তাবিত যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি ও উত্তরণের পথ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দেশীয় সার কারখানায় গ্যাস-সংকট, বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে করণীয় সম্পর্কে বিশদ বিশ্লেষণমূলক সম্পাদকীয়।

জীবনকালীন ভোগাধিকার আইন ও সামাজিক বাস্তবতার ভারসাম্য : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

পিতা-মাতার ভোগাধিকার রক্ষা করে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন পাস এবং শরিয়াহ বিষয়ক বিতর্কের বিষয়ে উভয়পক্ষের নিরপেক্ষ মূল্যায়নধর্মী বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দূরদর্শী পরিকল্পনা ও জাতীয় আস্থার গুরুত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য ও জ্বালানি সংকট সমাধানের মহাপরিকল্পনার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি সংকটে শত শত গাড়ির লংমার্চ বিরোধী দলের রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

এনসিপি ও ১১-দলীয় ঐক্যের চার বিভাগীয় লংমার্চের যৌক্তিকতা এবং চলমান জ্বালানি সংকটে সম্পদ সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বৈচিত্র্যময় শিল্প, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও কৌশলগত অর্থায়নের নতুন পথরেখা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়নে আইএসডিবির অর্থায়ন চুক্তির ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল খেলাপি ঋণ; ব্যাংকিং খাতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনের তথ্য মতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংক খাতের সংকট, অনিয়ম ও সমাধানের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনে দূরীকরণে প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে আগস্টে ২৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার। আইন প্রয়োগ ও সুরক্ষার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search