সম্পাদকীয় ডেস্ক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের এক বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বার্ষিক বাজেট (২০২৬–২৭ অর্থবছর) পাসের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।
গত ১১ জুন সংসদে উপস্থাপিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটের ওপর দীর্ঘ আলোচনা শেষে গত সোমবার (২৯ জুন, ২০২৬) সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমাপনী ভাষণটি কেবল একটি প্রথাগত বক্তৃতা ছিল না; বরং তা ছিল ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় রূপরেখা। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে দেশের পানি নিরাপত্তা, নিত্যপণ্যের বাজার ও সামষ্টিক অর্থনীতির যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা দেশের আপামর জনতাকে আশান্বিত করেছে।
বিশেষ করে, জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেকোনো মূল্যে ‘তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন এবং বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহারের জন্য ‘পদ্মা ব্যারেজ’ নির্মাণের যে ঘোষণা তিনি দিয়েছেন, তা দেশের কৃষি, পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক সুরক্ষার জন্য এক যুগান্তকারী ও সাহসী পদক্ষেপ।
বিগত সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের লাগামহীন দুর্নীতি, অবাধ লুণ্ঠন, ভুল নীতি ও কল্পনাতীত অর্থ পাচারের কারণে দেশের অর্থনৈতিক খাতগুলো যেভাবে সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, তাকে আড়াল না করে প্রধানমন্ত্রী সত্যকে অকপটে স্বীকার করেছেন।
তবে এই সংকটকে কোনোভাবেই ‘অজুহাত’ না বানিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে তা মোকাবিলা করার যে দৃঢ়তা তিনি দেখিয়েছেন, তা-ই মূলত একজন প্রকৃত জননেতার দর্শন। এই দর্শনের মূলে রয়েছে দুটি গভীর চেতনা—দেশের স্বার্থ রক্ষায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’।
এই লক্ষ্য পূরণে প্রধানমন্ত্রী তিন ধাপের যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কৌশল ঘোষণা করেছেন, তা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। প্রথম ধাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ ও খাদ্যনিরাপত্তা; দ্বিতীয় ধাপে রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারসহ রপ্তানি বহুমুখীকরণ; এবং চূড়ান্ত ধাপে উৎপাদনশীল উদ্ভাবননির্ভর প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক ভিত সুদৃঢ় করার পরিকল্পনাটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অর্থনৈতিক সংকট দ্রুত কেটে যাবে।
বাজেটটিকে ‘জীবনবান্ধব’ হিসেবে উল্লেখ করার পেছনে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬১টি পণ্যের ওপর থেকে কর প্রত্যাহার করার ফলে বাজেট পেশের আগে বা পরে বাজারে কৃত্রিমভাবে পণ্যের দাম না বাড়া বর্তমান সরকারের বাজার মনিটরিং ও জনবান্ধব নীতির এক বড় সাফল্য।
কৃষকদের ঋণ মওকুফ, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও প্রবাসী কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী জোরদার করার মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে, এই বাজেট মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণীর স্বার্থে নয়, বরং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৈরি।
একই সাথে, দেশের তরুণদের বছরের পর বছর চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেদের মেধা ও দক্ষতা দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে স্বপ্ন প্রধানমন্ত্রী দেখিয়েছেন, তার জন্য দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং চলচ্চিত্র, নাটক, সংগীত ও খেলাধুলার মতো ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতিকে মূল ধারায় আনার সিদ্ধান্তটি প্রশংসনীয়।
অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের সম্পদ পুনরুদ্ধারে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি দেশের মানুষের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনছে। বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল সম্পদ ফেরত আনতে ইতিমধ্যে ১৩টি দেশের সঙ্গে ২৩টি ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রিকোয়েস্ট’ পাঠানো এবং ৬০টিরও বেশি নন-ডিসক্লোজার চুক্তি স্বাক্ষর করার তথ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, লুণ্ঠিত অর্থ দেশে ফেরাতে আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও দেশীয় কোম্পানি বাপেক্সকে অবহেলা করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য শক্তির সম্প্রসারণে সরকারের গুরুত্বারোপ দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
সর্বোপরি, সংসদের ভেতরে ও বাইরে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক ইস্যুতে ‘জুলাই সনদ’-কে সামনে রেখে কাজ করার জন্য বিরোধী দলের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর উদার আহ্বান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সুস্থ ও দায়িত্বশীল চর্চার এক নতুন বাতাবরণ তৈরি করেছে। একটি রাষ্ট্র তখনই সফল হয়, যখন তার উন্নয়ন হয় ন্যায্যতাভিত্তিক এবং রাষ্ট্রটি হয় সম্পূর্ণ জবাবদিহিমূলক।
আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক দর্শন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে মাঠপর্যায়ে শতভাগ বাস্তবায়িত হবে এবং বাংলাদেশ একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।