জুলাই বিপ্লবের দুই বছর: ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও প্রত্যাশার হিসাব
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে বিশেষ প্রতিবেদন। কোটা সংস্কার আন্দোলন, ফারহান ফাইয়াজের শাহাদাত ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশার চালচিত্র।
সম্পাদকীয় ডেস্ক: ইতিহাসের পাতায় ২০২৪ সালের জুলাই এক নতুন এবং অবিনশ্বর বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে। এই জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের সংকীর্ণ এজেন্ডা ছিল না, বরং এটি ছিল এই দেশের আপামর নিপীড়নবিরোধী চেতনার এক প্রদীপ্ত ও প্রবহমান ধারাবাহিক অধ্যায়। জুলাই এসেছে গান গেয়ে, জুলাই এসেছে রাজপথে ছবি এঁকে, জুলাই এসেছে নামাজ পড়ে, আবার জুলাই এসেছে দেওয়ালে দেওয়ালে দ্রোহের কার্টুন ফুটিয়ে তুলে।
এই আন্দোলনের ক্যানভাস ছিল বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক—যেখানে বোরকা পরা ধার্মিক তরুণী এবং ওড়না ছাড়া বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো বৃষ্টিস্নাত বালিকার প্রতিবাদী স্লোগান মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই সাম্য ও স্বাধীনতার জুলাই সহজে আসেনি; জুলাই এসেছে শত শত তরুণের তাজা রক্তে ভেসে ভেসে, সন্তানের লাশ বুকে নিয়ে মায়ের চোখের নোনা অশ্রুর ঢলে আষাঢ়ের মতো প্লাবন ঘটিয়ে।
এই রক্তস্নাত বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে আজ যখন জুলাইয়ের বিপ্লবীদের মধ্যে সাময়িক কোনো মতবিরোধ দেখা যায়, তখন বিদেশে পালিয়ে থাকা বা আত্মগোপনে থাকা গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট শক্তি আওয়ামী লীগের দোসররা আনন্দে বগল বাজাতে শুরু করে। কিন্তু তাদের এই আনন্দ যে কতটা অলীক ও মূর্খতাসুলভ, তা তারা ভুলে গেছে।
জীবন বাজি রেখে স্বৈরাচারের বুলেটকে আলিঙ্গন করা মাঠের সহযোদ্ধারা এত সহজে তাদের আসল ও একক শত্রুকে ভুলে যায় না।
জুলাই অভ্যুত্থানের বুক থেকে উঠে আসা মাঠের বীরদের প্রতি পরাজিত শক্তির গভীর ভয় ও হিংসার নির্মম বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি বীর ছাত্রনেতা ওসমান হাদীর ওপর কাপুরুষোচিত হামলার মাধ্যমে। ফ্যাসিস্টদের দোসররা ওসমান হাদীর মতো অকুতোভয় বীরদের এতটাই ভয় পায় যে, তাদের চিরতরে স্তব্ধ ও হত্যা করতে তারা আজ মরিয়া হয়ে উঠেছে।
বিপ্লবের প্রথম সারির এই নায়কদের কেবল ‘শাউয়া-মাউয়া’ বা তুচ্ছ কোনো বিশেষণে সীমাবদ্ধ ও হেয় প্রতিপন্ন করার যে অপচেষ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চালানো হচ্ছে, তা এই সচেতন তরুণ সমাজের কাছে কখনোই সফল হবে না। ওসমান হাদীরা হলেন এই দ্বিতীয় স্বাধীনতার জীবন্ত প্রতীক, যাদের রক্ত ও ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে দেশ আজ ফ্যাসিবাদের মুক্ত বাতাস নিচ্ছে।
তাদের গায়ে হাত তোলার অর্থ হলো সরাসরি জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ও শহীদানদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা, যা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
বিগত দেড় দশকের খুনি ও লুটেরা স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী আজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে বিদেশে আশ্রয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা আন্তর্জাতিক লবিস্টদের মাধ্যমে “এই দেশে তোদের ঠাঁই হবে না” বলে দেশের মুক্তিকামী জনগণকে হুমকি দেওয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। অন্ধ বিবেকের এই সব অমানুষদের জেনে রাখা ভালো, তাদের এই অলিগার্কিক ও গণহত্যাকারী দুঃস্বপ্ন এই দেশের জাগ্রত তরুণ সমাজ আর কখনোই বাস্তবায়ন হতে দেবে না।
যে দল ও আদর্শ দেশের শত শত ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করতে পারে, শিশুদের বুক ঝাঁঝরা করে দিতে পারে, তাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন বা ঠাঁই এই বাংলার মাটিতে আর কোনোদিন হবে না। বাংলার মানুষ তাদের চিরতরে প্রত্যাখ্যান করেছে।
পরাজিত ফ্যাসিস্টদের কোনো হুমকি বা চক্রান্তই এই নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে রুখতে পারবে না। জুলাইয়ের চেতনা আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয়। যদি দেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জুলাইয়ের অর্জনকে নস্যাৎ করার জন্য কোনো অপশক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তবে এই দেশের তরুণ সমাজ আবারও রাজপথে নেমে আসবে।
প্রয়োজনে এই দেশের বুকে যতবার দরকার, ততবার জুলাই নেমে আসবে, কিন্তু ফ্যাসিবাদের অন্ধকারকে আর কখনো ফিরতে দেওয়া হবে না। বীর ওসমান হাদীদের রক্তের কসম, এই বাংলা কেবলই শোষিত ও নিপীড়নমুক্ত স্বাধীন মানুষের।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।