একটি কল্যাণকামী ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার নাগরিকদের জন্য মানসম্মত, সুলভ ও মানবিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিটি খাতের সংস্কার যখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে, তখন জনস্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল খাতের রূপান্তরে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত রোডম্যাপ অত্যন্ত জরুরি ছিল।
গত শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও চিকিৎসকদের পেশাগত দর্শনের ওপর যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন, তা দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক।
বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে দেওয়া এই বক্তব্য কেবল কিছু প্রতিশ্রুতির সংকলন নয়, বরং তা বাংলাদেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতকে খোলনলচে বদলে ফেলার এক দূরদর্শী ইশতেহার।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে রূঢ় অথচ বাস্তবমুখী দিকটি ছিল দেশীয় চিকিৎসার ওপর জনগণের আস্থা সংকট এবং এর ফলে সৃষ্ট বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি। প্রতিবছর উন্নত চিকিৎসার খোঁজে এ দেশের মানুষের বিদেশে পাড়ি জমানোর কারণে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বিশাল রক্তক্ষরণ।
প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত যথার্থই বলেছেন, এই সংকট কোনো আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দূর করা সম্ভব নয়। এর একমাত্র সমাধান চিকিৎসকদের ‘মানবিক অ্যাপ্রোচ’ বা সহমর্মী আচরণ এবং সঠিক চিকিৎসাদান। চিকিৎসকেরা রোগে-শোকে কাতর মানুষের পরম বন্ধু; একজন চিকিৎসকের আন্তরিক ব্যবহার ও সময়নিষ্ঠা অনেক সময় ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকরী হয়ে ওঠে। পেশাগত উৎকর্ষের পাশাপাশি চিকিৎসকদের এই মানবিক রূপটি যদি শতভাগ জাগ্রত হয়, তবেই দেশের সাধারণ মানুষ ঘরের কাছেই ভরসা খুঁজে পাবে এবং বিদেশমুখী প্রবণতা দ্রুত হ্রাস পাবে।
‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’—এই সনাতন ও কালজয়ী নীতিকে সামনে রেখে বর্তমান সরকার তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকাঠামো শক্তিশালী করতে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে, তা প্রশংসার দাবিদার। সারা দেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী, গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে পরিবারভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শ পৌঁছে দিতে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে। এর পাশাপাশি নতুন করে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগ এবং নার্স ও টেকনোলজিস্টদের শূন্যপদ পূরণের উদ্যোগ সরকারি হাসপাতালগুলোর জনবল সংকট দূর করবে।
শিক্ষা খাতের পর এবার দেশের ইতিহাসে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ ৬৯ হাজার৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া এবং আগামী পাঁচ বছরে তা জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা প্রমাণ করে, বর্তমান নির্বাচিত সরকার জনগণের জীবনমান সুরক্ষায় কতটা আন্তরিক ও বদ্ধপরিকর।
বাজেট বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ ও মধ্যবিত্ত রোগীদের পকেটের ওপর চাপ কমাতে হার্টের স্টেন্ট, ভাল্ভ, পেসমেকার, ডায়ালালাইসিস ফিল্টার এবং ক্যানসারের জীবনরক্ষাকারী ওষুধের কাঁচামালের ওপর থেকে ভ্যাট ও কর কমানো বা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি সরাসরি জনকল্যাণে ভূমিকা রাখবে। মফস্বলের রোগীদের শহরের দিকে ছুটে আসা কমাতে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ৩১ বা ৫১ শয্যা থেকে পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনাটি গ্রামীণ স্বাস্থ্য খাতের চিত্র বদলে দেবে। একই সাথে ঢাকার বাইরে শিশু স্বাস্থ্যের বিশেষায়িত চিকিৎসায় বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যার হাসপাতালসহ ৫টি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ ঢাকার ওপর রোগীর উপচে পড়া চাপ কমাবে।
তবে এই বিশাল উন্নয়ন পরিকল্পনা ও আধুনিকায়নের সুফল সাধারণ মানুষ তখনই পাবে, যখন এর সুষম ও দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত হবে। প্রধানমন্ত্রী যে দুটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন—হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং বিজ্ঞানসম্মত মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—তা কঠোরভাবে তদারকি করা প্রয়োজন। চিকিৎসকদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি উপজেলায় ১০ জন করে আনসার মোতায়েনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সময়োপযোগী, কারণ ভীতিহীন পরিবেশ ছাড়া চিকিৎসকেরা পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন না।
একই সাথে, হাসপাতালগুলোকে ‘ক্লিন’ ও জীবাণুমুক্ত রাখতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন আজ সময়ের দাবি।
৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২৪-এর জুলাই বিপ্লবের অবিচ্ছেদ্য অংশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের এই মিলন চত্বরে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, আমরাও তার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করি। ডিএমসিয়ান তথা দেশের সামগ্রিক চিকিৎসক সমাজ আমলাতান্ত্রিকতা ও বাণিজ্যিকীকরণের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাগত মানবিকতা ও বিশ্বমানের গবেষণায় আত্মনিয়োগ করবেন। সরকারের নীতিগত সহায়তা এবং চিকিৎসকদের সেবাব্রত মানসিকতার যুগলবন্দীতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং জনগণের হারানো আস্থা সম্পূর্ণ ফিরে আসবে—প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক