সম্পাদকীয়

স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক নারী শিক্ষা সহায়তার ঘোষণা, এক সুদূরপ্রসারী ও সাম্যবাদী রাষ্ট্রদর্শনের রূপরেখা : এম. নাজমুল হাসান

সম্পাদকীয় ডেস্ক: একটি প্রগতিশীল, বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নারীর সার্বিক উন্নয়ন ও শিক্ষার সমানাধিকার নিশ্চিত করা। যে সমাজে অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অন্ধকারে রেখে প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন দেখা হয়, সেই স্বপ্ন কখনো টেকসই হতে পারে না। এই শাশ্বত সত্যকে ধারণ করে দেশের নারী শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে এক নজিরবিহীন ও যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

গত বুধবার (৮ জুলাই, ২০২৬) বিকেলে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেন। সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান নির্বাচিত সরকার মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থা উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে এবার ডিগ্রি বা স্নাতক (অনার্স) স্তর পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবৈতনিক বা ফ্রি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

একই সঙ্গে ভালো ফলাফলের ভিত্তিতে ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে বিশেষ স্কলারশিপ বা বৃত্তি প্রদানের রূপরেখাও প্রকাশ করেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই সুদূরপ্রসারী ও জনকল্যাণমুখী চিন্তাকে আমরা জানাই গভীর সাধুবাদ। এটি কেবল নারী শিক্ষার হারই বাড়াবে না, বরং দেশের ‘উইমেন এম্পাওয়ারমেন্ট’ বা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

বাংলাদেশের নারী শিক্ষার ইতিহাসে অতীতেও এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে, যখন তাঁর সরকার মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক এবং উপবৃত্তি চালু করার বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই সময়োপযোগী নীতির সুফল আজ পুরো দেশ ভোগ করছে; প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ছেলেদের সমকক্ষ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দূরদর্শী ভাবনায় সেই ধারাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে স্নাতক পর্যন্ত বিস্তৃত করার যে ঘোষণা দিলেন, তা সমসাময়িক যুগে এক মাস্টারস্ট্রোক।

সংসদ গ্যালারিতে উপস্থিত থাকা নারী শিক্ষার্থীদের সামনে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি প্রমাণ করে, নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণে বর্তমান সরকার কতটা আন্তরিক। স্নাতক পর্যন্ত পড়াশোনা অবৈতনিক হলে গ্রামীণ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের কন্যারা আর অর্থাভাবে ঝরে পড়বে না। এর সঙ্গে মেধার ভিত্তিতে বৃত্তির সংযোজন ছাত্রীদের মধ্যে এক সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করবে, যা উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

সরকার একই সঙ্গে নারীদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার জন্য যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ব্যবস্থা চালু করেছে, তা গ্রামীণ নারীদের সরাসরি সামাজিকভাবে সুরক্ষিত করবে।

এই বাজেট অধিবেশনেই প্রধানমন্ত্রী আরেকটি অত্যন্ত মানবিক ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা সংসদের সামনে পেশ করেছেন, যা দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এক নীরব বিপ্লব ঘটাবে।

তিনি জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়নরত প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ শিক্ষার্থীর মাঝে পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও স্কুল ব্যাগ বিতরণ করবে সরকার। গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুদের জন্য স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ জোগাড় করা অনেক সময় বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, যা অনেক শিশুর স্কুলবিমুখতা বা ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ।

রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই উপহার শিশুদের মনে যেমন এক ধরনের সমতা ও আনন্দের অনুভূতি তৈরি করবে, তেমনি এটি প্রাথমিক স্তরে শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে জাদুকরী ভূমিকা রাখবে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর এই সুউচ্চ ও কল্যাণকামী পরিকল্পনাগুলোর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক দক্ষতা ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনার ওপর।

৬৫ হাজার স্কুলে ১ কোটি ২০ লাখ শিক্ষার্থীর কাছে নিখুঁতভাবে এই সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং স্নাতক স্তরে অবৈতনিক শিক্ষার তহবিল সুষমভাবে বণ্টন করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার দেয়াল ভেঙে এই প্রকল্পগুলোর বাজেট যেন সরাসরি ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

তদারকি ব্যবস্থায় কোনো প্রকার রাজনৈতিক প্রভাব বা স্বজনপ্রীতি বরদাস্ত করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দূরদর্শী শিক্ষা দর্শন যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কেবল একটি শিক্ষিত প্রজন্মই তৈরি করবে না, বরং ২০২৬ সালের এই নতুন বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে—এটাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন, ডা. জুবাইদা রহমানের মানবিক রাষ্ট্রদর্শন: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

তেজগাঁও সরকারি শিশু পরিবার ও ডে কেয়ার সেন্টার পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের কলাম।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের আট দশক, গৌরবময় ঐতিহ্য ও আধুনিক স্বাস্থ্য গবেষণার নতুন দিগন্ত : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০ বছর পূর্তি ও ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শুভেচ্ছা বার্তা। ঢামেকের অবদান নিয়ে রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম

জুলাইয়ের চেতনার সুরক্ষা ও ফ্যাসিবাদের বিচার: বিভাজন ও ব্যবসা পরিহারের রাজনীতিই হোক ভবিষ্যৎ পথরেখা

আগারগাঁওয়ে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য। আওয়ামী লীগের বিচার, বিএনপির সমন্বয় ও চেতনা বিক্রির ব্যবসার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি।

প্রথম জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস: জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা থেকে তারেক রহমানের আধুনিক গ্রাম দর্শন

প্রথমবারের মতো উদযাপিত হচ্ছে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬। শহীদ জিয়ার ১৯ দফা ও গ্রাম সরকার থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আধুনিক গ্রামীণ দর্শনের ওপর সম্পাদকীয়।

বন্ধ ও অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা চালুর উদ্যোগ: কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নে নতুন আশার আলো

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে বন্ধ ও অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা দ্রুত ও স্বচ্ছতার সাথে চালুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জুলাই বিপ্লবের দুই বছর: ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও প্রত্যাশার হিসাব

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে বিশেষ প্রতিবেদন। কোটা সংস্কার আন্দোলন, ফারহান ফাইয়াজের শাহাদাত ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশার চালচিত্র।

রক্তস্নাত জুলাইয়ের চেতনা ও বীর ওসমান হাদী: এই বাংলায় পরাজিত ফ্যাসিবাদের ঠাঁই আর হবে না

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো মৌলবাদী আন্দোলন ছিল না। বীর ওসমান হাদীকে হত্যার অপচেষ্টা ও বিদেশে বসে থাকা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের হুমকির বিরুদ্ধে সম্পাদকীয় কলাম।

৩৮ জেলায় নেই আইসিইউ: দেশের ক্রিটিক্যাল কেয়ার সংকটের ভয়াবহ চিত্র ও জরুরি স্বাস্থ্য সংস্কারের তাগিদ

বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের জাতীয় সম্মেলনে দেশে আইসিইউ শয্যা ও চিকিৎসকের তীব্র সংকটের চিত্র তুলে ধরলেন বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডা. জুবাইদা রহমান।

Search