সম্পাদকীয়

শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন, ডা. জুবাইদা রহমানের মানবিক রাষ্ট্রদর্শন: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন, ডা. জুবাইদা রহমানের মানবিক রাষ্ট্রদর্শন: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণের মূল শর্ত হলো কেবল ক্ষমতার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সমাজের প্রতিটি স্তরের, বিশেষ করে একদম প্রান্তিক ও কোমলমতি শিশুদের অধিকার ও বিকাশকে প্রাধান্য দেওয়া। চব্বিশের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে যে ‘নিপীড়নবিরোধী’ ও ‘বৈষম্যহীন’ চেতনার উদয় হয়েছে, তার মূল স্পিরিটই হলো একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

এই দর্শনের বাস্তবমুখী প্রতিফলন আমরা লক্ষ্য করেছি গত বুধবার রাজধানীর হাতিরঝিলে আয়োজিত এক বিশাল মতবিনিময়সভায়, যেখানে বিএনপির চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এক সুগভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছিলেন—“আমার আগে আমরা, আমাদের আগে দেশ; ক্ষমতার আগে জনতা, সবার আগে বাংলাদেশ।”

রাজনীতিতে যখন ব্যক্তিপূজা বা ক্ষমতার অন্ধ মোহ সমাজকে গ্রাস করে, তখন নেতার আগে জনতাকে স্থান দেওয়ার এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত রূপান্তর আজ রাষ্ট্র কাঠামোর প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার (৬ জুলাই, ২০২৬) প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি ডা. জুবাইদা রহমান রাজধানীর তেজগাঁও সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা) এবং ভূমি ভবন ও পানি ভবনের শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রসমূহ (ডে কেয়ার সেন্টার) পরিদর্শন করেন।

সেখানে শিশুদের উদ্দেশে তাঁর দেওয়া বক্তব্য—‘তোমরা জাতির ভবিষ্যৎ, তোমরাই আগামীর বাংলাদেশ এবং দেশ গড়ার মহান সৈনিক’—প্রমাণ করে যে, বর্তমান সরকার কেবল বর্তমানের সুশাসনই নয়, বরং আগামী দিনের বাংলাদেশের মজবুত ভিত্তি গঠনে কতটা দূরদর্শী ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

ডা. জুবাইদা রহমান তাঁর বক্তব্যে ‘আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট’ বা শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের ওপর যে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন, তা একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য অবিকল্প। শৈশব হলো মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে নৈতিকতা, শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। দিবা পরিচর্যা কেন্দ্রগুলো যে কেবল শিশুদের নিরাপদে রাখার স্থান নয়, বরং তা দেশের ভবিষ্যৎ সুনাগরিক গড়ার এক একটি অনন্য কারিগর—এই উপলব্ধি আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে এক বড় গুণগত পরিবর্তন।

বিশেষ করে, অন্যের সন্তানকে পরম মমতায় বড় করে তোলা কেয়ার গিভার মা-বোনদের কঠিন ও মানবিক কাজের প্রতি ডা. জুবাইদা রহমান যেভাবে রাষ্ট্রীয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন, তা শ্রমের মর্যাদা ও সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁদের এই নিঃস্বার্থ সেবার কারণেই আজ দেশের বহু কর্মজীবী নারী স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদ চিত্তে কর্মক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারছেন, যা দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখছে।

এই মানবিক ও প্রগতিশীল চিন্তার ঐতিহাসিক মূল আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী হাত ধরেই মাত্র ছয়টি ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশে এই প্রাতিষ্ঠানিক ধারণার যাত্রা শুরু হয়েছিল।

আজ তিন দশক পর, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্বে সেই দর্শন একটি পূর্ণাঙ্গ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। এই কর্মশালায় মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিসহ নীতিনির্ধারকদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, সরকার ‘আমি নয় আমরা’ এবং ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই স্লোগানকে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি শিশুর সুরক্ষায় ও নারীর কর্মসংস্থানে বাস্তবে রূপ দিতে বদ্ধপরিকর।

তবে হাতিরঝিলের মঞ্চে ঘোষিত সেই চমৎকার কল্যাণকামী দর্শন—“ক্ষমতার আগে জনতা”—যেমন মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি এই শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলোর সুযোগ-সুবিধা দেশের প্রতিটি উপজেলা ও প্রান্তিক কর্মজীবী নারীদের দোরগোড়ায় মানসম্মতভাবে পৌঁছে দেওয়া সরকারের জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির অভাব যেন এই মহতী উদ্যোগের গতি মন্থর না করে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, ডা. জুবাইদা রহমানের প্রদর্শিত এই মানবিক ও সমতাভিত্তিক পথরেখাকে ধারণ করে, দেশের আপামর জনতা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব একযোগে কাজ করলে বাংলাদেশ একটি শোষণমুক্ত, মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সাম্যের রাষ্ট্রে পরিণত হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি ও উত্তরণের পথ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দেশীয় সার কারখানায় গ্যাস-সংকট, বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে করণীয় সম্পর্কে বিশদ বিশ্লেষণমূলক সম্পাদকীয়।

জীবনকালীন ভোগাধিকার আইন ও সামাজিক বাস্তবতার ভারসাম্য : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

পিতা-মাতার ভোগাধিকার রক্ষা করে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন পাস এবং শরিয়াহ বিষয়ক বিতর্কের বিষয়ে উভয়পক্ষের নিরপেক্ষ মূল্যায়নধর্মী বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দূরদর্শী পরিকল্পনা ও জাতীয় আস্থার গুরুত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য ও জ্বালানি সংকট সমাধানের মহাপরিকল্পনার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

জ্বালানি সংকটে শত শত গাড়ির লংমার্চ বিরোধী দলের রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

এনসিপি ও ১১-দলীয় ঐক্যের চার বিভাগীয় লংমার্চের যৌক্তিকতা এবং চলমান জ্বালানি সংকটে সম্পদ সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বৈচিত্র্যময় শিল্প, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও কৌশলগত অর্থায়নের নতুন পথরেখা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়নে আইএসডিবির অর্থায়ন চুক্তির ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল খেলাপি ঋণ; ব্যাংকিং খাতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনের তথ্য মতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংক খাতের সংকট, অনিয়ম ও সমাধানের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনে দূরীকরণে প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে আগস্টে ২৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার। আইন প্রয়োগ ও সুরক্ষার ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী -ঐতিহ্য, সংহত অগ্রগতি ও ভবিষ্যতের রূপরেখা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

১লা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় উন্নয়ন, গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ার বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search