খামেনির জানাজায় গেলে সাহায্য বন্ধের হুমকি মার্কিনদের
ইরানের সদ্যপ্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্য ও জানাজার অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যাতে অংশ না নেয়, সেজন্য ব্যাপক কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।…
একটি আধুনিক, টেকসই ও বাসযোগ্য মেগাসিটি গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো তার ট্রাফিক ব্যবস্থার শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন নীতি প্রণয়ন করা। চব্বিশের ঐতিহাসিক বিপ্লবের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশনে দেশ ও জনকল্যাণমুখী নানাবিধ সংস্কারের যে হাওয়া বইছে, তার একটি অত্যন্ত জরুরি ও সময়োপযোগী প্রতিফলন দেখা গেল সড়ক পরিবহন খাতে।
গত সোমবার (১৩ জুলাই, ২০২৬) সংসদের ২৩তম কার্যদিবসে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য শওকত আরা আক্তারের কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন যে, ঢাকা মহানগরসহ সারাদেশে ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য সরকার খুব শিগগিরই একটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত নীতিমালা দিতে যাচ্ছে।
এই শিল্পের সাথে জড়িত লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানকে ধ্বংস না করে, একে একটি নিয়মতান্ত্রিক আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তা দূরদর্শী এবং প্রশংসার দাবিদার।
আমাদের দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকগুলো একই সাথে একটি বড় স্বস্তি এবং বিশাল ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় এই হালকা যানবাহনগুলো যখন প্রধান সড়কগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত গতিতে চলাচল করে, তখন তা মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার জন্ম দেয়। তাছাড়া প্রথাগত রিকশার বডিতে কোনো প্রকার কাঠামোগত পরিবর্তন না করেই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মোটর ও লোকাল ব্যাটারি যুক্ত করার ফলে ব্রেকিং সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে, যা প্রতিনিয়ত উল্টে গিয়ে যাত্রী ও পথচারীদের জখম করছে।
এর ওপর রয়েছে ট্রাফিক সাইন না মানা এবং উল্টো পথে চলার এক সর্বনাশা প্রবণতা, যা রাজধানীর মোড়ে মোড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি করছে এবং ট্রাফিক বিভাগকে গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
তবে মুদ্রার অপর পিঠও আমাদের দেখতে হবে। সংসদ সদস্য শওকত আরা আক্তার তাঁর নোটিশে অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন যে, পরিবহন খাত দেশের মোট কার্বন নিঃসরণের একটি বড় অংশের জন্য দায়ী। এই প্রেক্ষাপটে, জীবাশ্ম জ্বালানির (অকটেন, ডিজেল, পেট্রোল) পরিবর্তে বিদ্যুৎ, সিএনজি, এলএনজি বা সবুজ হাইড্রোজেনের মতো পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে রূপান্তর আজ সময়ের দাবি।
ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজিবাইকগুলো যেহেতু সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক শক্তিতে চলে, তাই এগুলো থেকে সরাসরি কোনো বিষাক্ত ধোঁয়া বা কার্বন নিঃসরণ হয় না। দেশের গণপরিবহনকে পর্যায়ক্রমে ইভিতে রূপান্তর করার উপকারিতা বহুমুখী। এটি একদিকে যেমন আমদানিকৃত খনিজ তেলের ওপর আমাদের বিশাল অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমাবে, অন্যদিকে বায়ু ও শব্দ দূষণ কমিয়ে নগরের জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে।
তবে এই ব্যাটারিগুলো চার্জ করার ক্ষেত্রে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের যে অভিযোগ রয়েছে, তা বন্ধ করে সৌরশক্তি চালিত চার্জিং স্টেশনের আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন।
সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, এই খাতটিকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা বন্ধ করে দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না; কারণ এর সাথে কোটি মানুষের জীবিকা এবং স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের প্রশ্ন জড়িত। এর প্রকৃত সমাধান হলো একটি সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের আওতায় এনে কঠোর নিয়মনীতি ও শৃঙ্খলার মধ্যে পরিচালনা করা। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
ঢাকা সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের যৌথ উদ্যোগে ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য সুনির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করে দিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এদের প্রধান সড়ক বা হাইওয়েতে উঠতে দেওয়া যাবে না; কেবল সংযোগ সড়ক (ফিডার রোড) বা গলির ভেতরে চলাচলের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
যত্রতত্র তৈরি লোকাল রিকশাকে নিষিদ্ধ করে বুয়েট বা কোনো স্বীকৃত প্রকৌশল সংস্থার মাধ্যমে এর ডিজাইন বা বডি কাঠামো আধুনিকায়ন করতে হবে, যাতে উচ্চ গতিতেও এর ভারসাম্য ঠিক থাকে এবং ব্রেকিং সিস্টেম কার্যকর হয়।
যান্ত্রিক যান চালানোর জন্য চালকদের ন্যূনতম প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা এবং একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে লাইসেন্স বা কিউআর কোড যুক্ত ডিজিটাল নম্বর প্লেট প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে।
একটি বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে আমাদের সনাতন ও ত্রুটিপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের ঘোষিত আসন্ন সমন্বিত নির্দেশিকাটি যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না পড়ে, বরং দ্রুত বাস্তবায়িত হয়।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষের কর্মসংস্থান ধরে রেখে একটি সুশৃঙ্খল মাল্টি-মোডাল যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাই হোক সরকারের মূল লক্ষ্য—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।