দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পের অস্তিত্ব রক্ষা ও চলমান সংকট থেকে উত্তরণে একটি আলাদা ‘জাতীয় চামড়া বোর্ড’ গঠনের দাবি জানিয়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে আসন্ন ঈদুল আজহার কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ ঋণসুবিধা, রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি সহজ করা, হিমাগার নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক সনদের প্রতিবন্ধকতা দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
আজ শনিবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব দাবি ও প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। ‘অস্তিত্ব সংকটে চামড়াশিল্প উত্তরণের উপায় অনুসন্ধান’ শীর্ষক এই সেমিনারটির আয়োজন করে লেদার ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন লেদার ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক সাদাত হোসেন। মূল বক্তব্যে তিনি এ খাতের প্রতি নীতিগত অবহেলার চিত্র তুলে ধরে বলেন, “চা–শিল্পের জন্য দেশে চা বোর্ড আছে, বস্ত্রের জন্য মন্ত্রণালয় আছে। কিন্তু চামড়ার মতো এত বড় সম্ভাবনাময় খাতের কোনো অভিভাবক সংস্থা নেই। তাই এ শিল্পের জন্য একটি জাতীয় চামড়া বোর্ড গঠন করা এখন সময়ের দাবি।”
তিনি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “৪০ শতাংশের বেশি মূল্য সংযোজন (ভ্যালু এডিশন) করা হলেও চামড়া খাতের প্রতি কোনো গুরুত্ব নেই। অন্যদিকে মাত্র ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন করে তৈরি পোশাক খাত ৯৭ শতাংশ প্রণোদনা লুফে নিচ্ছে।”
সেমিনারে জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিশেষজ্ঞরা চামড়া খাতের সংকট নিয়ে কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আবদুল মুত্তালিব বলেন, “বিশ্বে বর্তমানে ৫৬০ বিলিয়ন ডলারের চামড়ার বাজার রয়েছে। আমরা যদি সেখানে মাত্র ১ শতাংশও অবদান রাখতে পারতাম, তবে আমাদের রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেত। এখনো পিছিয়ে থাকলেও এই খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার অভিযোগ করে বলেন, “সোনার খনির মতো চামড়া খাতকে আমরা অবহেলায় নষ্ট করছি। মূলত রাজনৈতিক কারণে এ খাতের সম্ভাবনা আটকে আছে। বর্তমান সংকটের সুযোগ নিয়ে খুলনা ও যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশের মূল্যবান চামড়া বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।”
এ সময় উপস্থিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য কামাল হোসেন চামড়া খাতের এই গুরুতর সমস্যাগুলো জাতীয় সংসদসহ সরকারের যথাযথ নীতি-নির্ধারণী ফোরামে উপস্থাপন করার দৃঢ় আশ্বাস দেন। সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন।
আন্তর্জাতিক সনদের অসুবিধা দূর করতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা নিয়ে ট্যানারিগুলোতে ছোট ছোট সেন্ট্রাল ইটিপি (ETP) নির্মাণ এবং ২০ বছরের মধ্যে সেই ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে আসন্ন কোরবানি ঈদে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত প্রান্তিক ও ছোট ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান এবং দেশের চামড়ার ঘরোয়া বাজার সৃষ্টিতে স্কুলের বাচ্চাদের জন্য চামড়ার তৈরি জুতা ও ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চামড়া পচন রোধে কৌশলগত স্থানে হিমাগার নির্মাণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের রাসায়নিক আমদানি শুল্কমুক্ত বা সহজ করার আহ্বান জানান বক্তারা।