কৃষি ও অর্থনীতি

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে, বাড়ছে দারিদ্র্য ও বৈষম্য: বিশ্বব্যাংক

অর্থনীতি: বেসরকারি বিনিয়োগ ও রপ্তানি কমে যাওয়া, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সংকোচনের কারণে দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্যও বেড়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। পরের দুই অর্থবছরে তা কমে যথাক্রমে ৪ দশমিক ২ ও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

প্রবৃদ্ধি কমার অন্যতম কারণ বিনিয়োগে স্থবিরতা। গত অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নও দুর্বল হয়েছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্প পর্যালোচনা, নতুন প্রকল্প অনুমোদনে সতর্কতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতির কারণে উন্নয়ন ব্যয় কমেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে বিশ্বব্যাংক। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, মূলধনের ঘাটতি এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। ইসলামি ব্যাংকগুলোতে এই হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার বা সিএআর ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে। আন্তর্জাতিক ন্যূনতম মান যেখানে ১০ শতাংশ।

এদিকে চলতি বছরের জুনে ব্যক্তি ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি। বিপরীতে সরকারের ব্যাংকঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের মতে, সরকারের উচ্চমাত্রার ব্যাংকঋণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ সংকুচিত করছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে গত এক বছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নেমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে এলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও উঁচুতে রয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরকারি বরাদ্দ থাকলেও তা যথাযথভাবে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পরিবারও বিভিন্ন কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের অপ্রতুলতা শিল্প উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ শতাংশে নেমে আসার কথা বলা হয়েছে। গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে।

জ্বালানি সংকটে বিভিন্ন কারখানা উৎপাদন কমিয়েছে, কর্মঘণ্টা হ্রাস করেছে কিংবা কর্মী ছাঁটাই করেছে। এর প্রভাব শ্রমবাজারেও পড়েছে। বিশেষ করে শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারিয়ে অনেক নারী শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন।

অর্থনীতির চাপের মধ্যেও প্রবাসী আয় ইতিবাচক ধারা ধরে রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

তবে একই সময়ে নিট বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই ১৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ কমেছে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ।

অন্যদিকে বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতি ডলারের গড় আন্তব্যাংক দর ছিল ১২২ টাকা ১০ পয়সা।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সীমিত করভিত্তি, কর ফাঁকি, দুর্বল প্রশাসন এবং অতিরিক্ত করছাড় রাজস্ব বাড়ানোর পথে বাধা হয়ে রয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ কর আদায় করেছে। মোট রাজস্ব জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হলেও তা এখনও দেশের উন্নয়ন চাহিদার তুলনায় কম।

সরকারের মোট ব্যয় জিডিপির ১১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। তবে চলতি ব্যয় বাড়লেও মূলধনি ব্যয়ের অংশ কমেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সরকারের মোট অর্থায়নের ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে। আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের মতে, সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়তে থাকলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ আরও সংকুচিত হতে পারে। এতে সুদের হার উঁচু থাকা, বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সরকারি ঋণও জিডিপির ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। একই সঙ্গে সুদ পরিশোধের ব্যয় জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।

আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। তবে দ্রুত দারিদ্র্য কমানোর জন্য এই কর্মসংস্থান যথেষ্ট হবে না বলে মনে করছে সংস্থাটি।

জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। পরের অর্থবছরে তা সামান্য কমে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে।

মূল্যস্ফীতিও দ্রুত কমার সম্ভাবনা সীমিত। জ্বালানির দাম, সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা এবং সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি মূল্যস্ফীতিকে উঁচু পর্যায়ে রাখতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক তিনটি খাতে দ্রুত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

সম্পদের মান পর্যালোচনা দ্রুত শেষ করা, দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করা এবং ব্যাংকের মালিকদের লোকসানের দায় বহনের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, এলএনজি অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং বিদ্যুৎ কেনায় স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করার কথা বলেছে বিশ্বব্যাংক।

করনীতি ও কর প্রশাসন পৃথক করা, কর ফাঁকি কমানো এবং ঢালাও করছাড়ের প্রবণতা কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, রাজস্ব সংস্কার এবং দরিদ্র মানুষের জন্য আরও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আবারও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে।

Related News

মাল্টার চেয়ে ১৪৬ গাড়ি আমদানিতে শুল্ক কর কম

প্রতি কেজি মাল্টার আমদানি মূল্য প্রায় ৮৭ টাকা হলেও শুল্ক-কর দিতে হচ্ছে প্রায় ১০৭ টাকা। মোট শুল্ক-করভার ১২১.৭৮ শতাংশ, যা ১৪৬টি গাড়ির চেয়েও বেশি।

ফ্যামিলি কার্ডে আরও ২৮.৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব: বিশ্বব্যাংক

ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে খাদ্য ভর্তুকি ও নগদ সহায়তা কর্মসূচির সমন্বয় করলে বাংলাদেশে আরও ২৮.৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা বৃদ্ধি ও বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে

চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে। অন্যদিকে ব্যাংকে সরকারের ঋণ বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতির গতিপথ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। অর্থনীতি সংবাদ।

ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়ল লিটারে প্রায় ১২ টাকা

ফার্নেস অয়েলের দাম লিটারে ১১ টাকা ৯২ পয়সা বাড়িয়েছে বিইআরসি। নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে লিটারপ্রতি ১০৮ টাকা ৭৮ পয়সা, যা ৩০ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা থেকে কার্যকর হয়েছে।

গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার নিচে বাংলাদেশ

গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৬-এ ২১.৫ স্কোর নিয়ে ১৩৯ দেশের মধ্যে ১০৫তম বাংলাদেশ। নেপাল ১০৪তম হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার ছয় অর্থনীতির মধ্যে সবচেয়ে নিচে নেমেছে দেশটি।

ডলারের দাম বেড়ে ১২৩ টাকা ৩ পয়সা

বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের গড় দাম বেড়ে ১২৩ টাকা ৩ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। পাউন্ড, রুপি, ইউয়ান ও সিঙ্গাপুরি ডলারের দামও বেড়েছে।

দুই দিন পর আবার বাড়ল সোনার দাম, ভরিতে ২ হাজার ২১৬ টাকা

দেশের বাজারে টানা দুই দিন কমার পর আবারও সোনার দাম বেড়েছে। বুধবার ভরিতে সর্বোচ্চ ২ হাজার ২১৬ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের সোনার দাম ২ লাখ ৩০ হাজার ৭৭২ টাকা নির্ধারণ করেছে বাজুস।

এসএমই ও রিটেইল ব্যাংকিংয়ে জোর দিচ্ছে সিটিজেনস ব্যাংক

এসএমই, রিটেইল ও কৃষি খাতে ঋণ বাড়ানোর পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণে পরিকল্পনা নিয়েছে সিটিজেনস ব্যাংক। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ০.৩২ শতাংশ বলে দাবি করা হয়েছে।

Search