সম্পাদকীয়

জুলাই গ্রাফিতি : স্বৈরাচারী শাসনের পতনের সাক্ষ্য

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে “জুলাই গ্রাফিতি” কেবল দেয়ালচিত্র নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। জুলাই গ্রাফিতিগুলো বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের প্রতিরোধের ভাষা এবং ইতিহাসের একটি দৃশ্যমান দলিল। এগুলো কেবল দেয়ালচিত্র নয়, বরং আন্দোলনের সময়কার বীরত্ব, শোক এবং জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এই চিত্রগুলোর মাধ্যমেই ছাত্র-জনতা তাদের দাবির কথা দেয়ালে দেয়ালে খোদাই করে দিয়েছিল, যা একটি স্বৈরাচারী শাসনের পতনের সাক্ষ্য বহন করে। ফলে এগুলো মুছে ফেলার যেকোনো প্রচেষ্টা সাধারণ মানুষের আবেগের জায়গায় আঘাত হানে এবং আন্দোলনের চেতনাকে ক্ষুণ্ণ করার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের টাইগারপাস ও লালখানবাজার এলাকায় উড়ালসড়কের পিলারে আঁকা জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মুছে ফেলাকে কেন্দ্র করে এক তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা এসব গ্রাফিতি সাদা রঙ দিয়ে ঢেকে দেন।

আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে যে, চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের নির্দেশে আন্দোলনের ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং সেখানে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর প্রতিবাদে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা পুনরায় গ্রাফিতি আঁকতে গেলে পুলিশের সাথে তাদের হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ওই এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে সব ধরণের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে।

তবে পরবর্তীতে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগকে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, সিটি সৌন্দর্যবর্ধনের রুটিন কাজের অংশ হিসেবে পোস্টারযুক্ত পিলারগুলো রঙ করা হয়েছে, জুলাইয়ের গ্রাফিতি মোছার কোনো নির্দেশ তিনি দেননি। মেয়র নিজেকে এই আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষক দাবি করে আরও জানান যে, তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং চসিকের পক্ষ থেকে আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের সহায়তায় আরও পরিকল্পিত ও শৈল্পিক গ্রাফিতি আঁকার ব্যবস্থা করবেন।

এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণ এখন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক ধরণের “লিগ্যাসি” বা উত্তরাধিকার প্রমাণের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

বিএনপি দলগতভাবে জুলাই বিপ্লবের একনিষ্ঠ সমর্থক এবং একে তাদের দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলনের চূড়ান্ত ফল হিসেবে বিবেচনা করে। দলটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং অন্যান্য নেতারা এই অভ্যুত্থানকে “গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধার” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন ।

চট্টগ্রামের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন নিজেও দাবি করেছেন যে, জুলাই আন্দোলনে প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরাম তাঁরই অনুসারী ছিলেন এবং তিনি নিজে আহতদের চিকিৎসার জন্য ব্যাপক আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তা প্রদান করেছেন। বিএনপি মনে করে, জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করেই তারা বর্তমানে “বাংলাদেশ ফার্স্ট” বৈদেশিক নীতি এবং জাতীয় সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করছে ।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ: সাইবার নিরাপত্তায় লাল সংকেত নাকি সময়োচিত সতর্কতা? -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

বৈশ্বিক সাইবার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধের নেপথ্য কারণ ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

প্রধানমন্ত্রীর খুলনা-বাগেরহাট সফর সম্পন্ন; আঞ্চলিক বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর সমাপ্তি, মোংলা বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

মোংলা থেকে উপকূলের জাগরণ — প্রধানমন্ত্রীর সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন সফর নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশ্লেষণাত্মক কলাম।

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার — সম্প্রীতির বাংলাদেশ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

মহানবমীতে তিন বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক পূজা মণ্ডপ সফর ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

নাগরিকত্বই পরিচয়, ধর্ম নয় – তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশের বার্তা। -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রীর দুর্গোৎসব সফর, সেনাবাহিনীতে ওআরওপি সুবিধা এবং বর্তমান রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাই আগামীর বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের তাৎপর্য- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার দিক নির্দেশনার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

ব্যাংককে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের শেষ দিন আজ, ২০২৭ সালের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান

থাইল্যান্ডে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বার্ষিক সভা শেষ। ২০২৭ সালের বোর্ড অব গভর্নরসের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান। ব্যাংকক থেকে রিপোর্ট।

ব্যাংককে বিশ্ব অর্থনীতির নতুন দিগন্ত: সংস্কারের শর্তে বাংলাদেশের সামনে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের সুযোগ-রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সম্মেলনে বাংলাদেশের ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

Search