সংসদে নতুন জুয়া প্রতিরোধ বিল: অনলাইন জুয়ার মরণছোবল থেকে যুবসমাজকে রক্ষার এখনই সময়
সংসদে ২৪ ধরনের অপরাধ অন্তর্ভুক্ত করে নতুন জুয়া প্রতিরোধ বিল এনেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। অনলাইন জুয়া থেকে যুবসমাজকে রক্ষায় সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ।
সম্পাদকীয় ডেস্ক: তথ্যের অবাধ প্রবাহের এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন আমাদের নাগরিক জীবনকে সহজ করেছে, ঠিক তেমনি এর অনিয়ন্ত্রিত অপব্যবহার ও ‘ফেক আইডি’র মরণছোবল সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভার্চ্যুয়াল জগতের এই নৈরাজ্য, গুজব ও অপপ্রচার ঠেকাতে অপরাধীদের আইনি কাঠামোর আওতায় আনার সরকারি উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
গত বুধবার (২৪ জুন, ২০২৬) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেক আইডি ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’-এ নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেন সেলিমের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সরকারের এই নীতিনির্ধারণী ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল করতে হলে আইনি কাঠামোর পাশাপাশি শক্তিশালী প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা অপরিহার্য। তবে প্রযুক্তিগত জায়গায় আমাদের সীমাবদ্ধতার একটি বড় চিত্রও এই প্রশ্নোত্তর পর্বে উন্মোচিত হয়েছে।
যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. গোলাম রছুলের প্রশ্নের জবাবে তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী অকপটে স্বীকার করেছেন যে, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি বা গোয়েন্দা সংস্থার অনুরোধে আপত্তিকর ওয়েবসাইট বা কনটেন্ট ব্লক করার নির্দেশ বিটিআরসি দিলেও, এই ধরনের কার্যক্রম সরাসরি পরিচালনার জন্য বিটিআরসির নিজস্ব কোনো প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি নেই। একটি দেশের প্রধান টেলিকমিউনিকেশন নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই প্রযুক্তিগত পরনির্ভরশীলতা বা সীমাবদ্ধতা সাইবার অপরাধ দমনের গতিকে মন্থর করতে পারে।
অতএব, আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম যেমন ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকের ওপর কেবল চিঠিপত্রের মাধ্যমে নির্ভর না করে, বিটিআরসিকে নিজস্ব আধুনিক ল্যাব ও স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী করা এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে, মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএস ব্যবহার করে যে অভিনব ডিজিটাল জালিয়াতি ও প্রতারণা চলছে, তা প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিটিআরসির যৌথ উদ্যোগে আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। বিশেষ করে, সিম কার্ড নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে নিশ্ছিদ্র ও সুরক্ষিত করতে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফেশিয়াল রিকগনিশন’ বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ পদ্ধতি চালুর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ডিজিটাল জালিয়াতি চক্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এর ফলে অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র চুরি করে বা আঙুলের ছাপ জালিয়াতি করে ভুয়া সিম তোলার পথ চিরতরে বন্ধ হবে।
তবে আইন প্রণয়ন বা প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে একটি বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে—অপপ্রচার বা গুজব প্রতিরোধের নামে এই আইন যেন কোনোভাবেই স্বাধীন সাংবাদিকতা, মুক্তমত প্রকাশ বা নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব করার হাতিয়ারে পরিণত না হয়।
অতীতে ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা দেশের মানুষের রয়েছে, ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ সংস্কারের সময় সেই ত্রুটিগুলো দূর করতে হবে। গুজব এবং যৌক্তিক সমালোচনার মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্যটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া এবং সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে সাইবার সচেতনতা তৈরির মাধ্যমেই কেবল একটি নিরাপদ ও সুস্থ ধারার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।