সম্পাদকীয়

আকস্মিক বন্যা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর তড়িৎ নির্দেশনা এবং আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশ বরাবরই প্রাকৃতিক দুর্যোগের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে অবিরাম ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, বিশেষ করে বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলা আকস্মিক বন্যার কবলে পড়েছে।

হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন, নষ্ট হয়েছে ফসল এবং তলিয়ে গেছে গ্রামীণ রাস্তাঘাট। এমন একটি জাতীয় সংকটে ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুহূর্তে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যে ধরনের দ্রুত ও সংবেদনশীল সাড়া প্রয়োজন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার ঠিক সেই দায়িত্বশীলতারই পরিচয় দিয়েছে।

গত শুক্রবার (১০ জুলাই, ২০২৬) দিনভর বন্যাকবলিত জেলাগুলোর মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক প্রধানদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতার তড়িৎ নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে যেভাবে সমন্বিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা দুর্যোগ কবলিত বিপন্ন মানুষের মনে এক বিশাল ভরসা ও আশার আলো তৈরি করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রী কেবল ঢাকায় বসে ফাইলবন্দী নির্দেশনা দেননি; বরং তিনি নিজেই বন্যাকবলিত অঞ্চলের জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) এবং সিভিল সার্জনদের সাথে কথা বলে চিকিৎসাসেবা ও উদ্ধার অভিযানের খোঁজ নিয়েছেন।

এই দুর্যোগকালীন পুনর্বাসন ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে বিশেষ সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া এবং ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম. ইকবাল হোসেইনসহ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আজ শনিবারই সরাসরি চট্টগ্রামে পাঠানো সরকারের একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ। মাঠপর্যায়ে মন্ত্রীদের এই সশরীরে উপস্থিতি আমলাতান্ত্রিক সুতার টানকে শিথিল করবে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।

প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার মধ্যে কয়েকটি বিশেষ মানবিক ও কৌশলগত দিক আমাদের বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যা একটি ‘ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী’ রাষ্ট্রদর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ:

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি সংবেদনশীলতা: প্রধানমন্ত্রী বন্যাকবলিত এলাকার নারী, শিশু এবং বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের প্রতি বিশেষ যত্নশীল থাকার এবং তাঁদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে ও বিশেষ চিকিৎসাসেবায় নেওয়ার যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা অত্যন্ত মানবিক। দুর্যোগের সময় এই গোষ্ঠীগুলোই সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত থাকে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও চোর-ডাকাত চক্রের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি: বন্যার মতো মানবিক বিপর্যয়ের সুযোগ নিয়ে অতীতে একশ্রেণীর অসাধু ও অপরাধী চক্রকে মানুষের ঘরবাড়িতে চুরি-ডাকাতি বা ত্রাণ চুরির মতো জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হতে দেখা গেছে। এই বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ প্রমাণ করে যে, সরকার দুর্গতদের জানমালের নিরাপত্তায় কতটা কঠোর।

দলীয় নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততা: প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তাঁর দলীয় নেতা-কর্মীদেরও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা যেভাবে শুরু থেকেই মাঠপর্যায়ে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে জনগণের পাশে রয়েছেন, তা রাজনৈতিক জবাবদিহিতার এক ইতিবাচক উদাহরণ।

তবে কোনো কোনো এলাকায় বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও এই দুর্যোগের আসল চ্যালেঞ্জটি শুরু হবে ‘পোস্ট-ফ্লাড’ বা বন্যা-পরবর্তী সময়ে। পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে বন্যাকবলিত এলাকায় ডায়রিয়া, জণ্ডিস বা চর্মরোগের মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তাই সিভিল সার্জনদের নেতৃত্বে পর্যাপ্ত মেডিকেল টিম এবং বিশুদ্ধ পানি ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ ব্যবস্থা এখন থেকেই শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। ভেঙে যাওয়া কাঁচা রাস্তাঘাট, কালভার্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি দ্রুত মেরামতের জন্য পুনর্বাসন বাজেট সরাসরি ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে পৌঁছাতে হবে, যাতে এর মাঝে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দুর্নীতিবাজ চক্র থাবা বসাতে না পারে।

আমরা বিশ্বাস করি, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিটই ছিল একটি সাম্য, স্বনির্ভর ও মানবিক সমাজ গঠন। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগকে আমাদের সেই মানবিকতা ও ঐক্যের পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে নিতে হবে। সরকারের এই তড়িৎ ও দূরদর্শী উদ্যোগের সাথে দেশের আপামর জনতা, ধনাঢ্য শ্রেণী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যদি একযোগে কাজ করে, তবে এই বন্যা পরিস্থিতি কাটিয়ে আমরা দ্রুতই একটি সমৃদ্ধ ও স্বস্তিদায়ক নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সক্ষম হব—এটাই আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা।

লিখেছেন: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, লেখক পরিচিতি: বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Related News

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ: সাইবার নিরাপত্তায় লাল সংকেত নাকি সময়োচিত সতর্কতা? -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

বৈশ্বিক সাইবার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধের নেপথ্য কারণ ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

প্রধানমন্ত্রীর খুলনা-বাগেরহাট সফর সম্পন্ন; আঞ্চলিক বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর সমাপ্তি, মোংলা বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

মোংলা থেকে উপকূলের জাগরণ — প্রধানমন্ত্রীর সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

খুলনা ও বাগেরহাটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন সফর নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশ্লেষণাত্মক কলাম।

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার — সম্প্রীতির বাংলাদেশ রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

মহানবমীতে তিন বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক পূজা মণ্ডপ সফর ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

নাগরিকত্বই পরিচয়, ধর্ম নয় – তারেক রহমানের নতুন বাংলাদেশের বার্তা। -রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রীর দুর্গোৎসব সফর, সেনাবাহিনীতে ওআরওপি সুবিধা এবং বর্তমান রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাই আগামীর বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের তাৎপর্য- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার দিক নির্দেশনার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের নিবন্ধ।

ব্যাংককে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের শেষ দিন আজ, ২০২৭ সালের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান

থাইল্যান্ডে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বার্ষিক সভা শেষ। ২০২৭ সালের বোর্ড অব গভর্নরসের চেয়ারম্যানশিপ পেল পাকিস্তান। ব্যাংকক থেকে রিপোর্ট।

ব্যাংককে বিশ্ব অর্থনীতির নতুন দিগন্ত: সংস্কারের শর্তে বাংলাদেশের সামনে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের সুযোগ-রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ সম্মেলনে বাংলাদেশের ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে বিশিষ্ট কলামিস্ট রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশেষ কলাম।

Search