পটুয়াখালীতে পুলিশের কাছ থেকে আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবাবলীতে পরোয়ানাভুক্ত আসামিকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি নেতা ইদ্রিস খানের লোকজনের বিরুদ্ধে।
রাজধানীর উত্তরার একটি আবাসিক হোটেলে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানের সময় আটক নারীদের জোরপূর্বক মুখ খুলে ভিডিও ধারণ এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক ও আইনি প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। অপরাধ প্রমাণের আগেই তল্লাশি ও আটক প্রক্রিয়ায় জোরপূর্বক চেহারা দেখানোর বাধ্যবাধকতাকে সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনার সরাসরি লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞগণ।
গত ১২ আগস্ট রাজধানীর আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার ‘নিউ রংধনু’ আবাসিক হোটেলে ডিবির উত্তরা বিভাগের একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। ওই অভিযানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, একটি কক্ষে একাধিক নারী আটক অবস্থায় বসে আছেন। কোনো আটক ব্যক্তি যেন মুখ ঢাকতে না পারেন, সেজন্য দুজন নারী পুলিশ সদস্য তাঁদের হাত, শাড়ির আঁচল, মাস্ক বা ওড়না টেনে ধরে জোরপূর্বক মুখমণ্ডলের ভিডিও ধারণ নিশ্চিত করছিলেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত ভিডিওতে পুলিশের এক নারী সদস্যকে বলতে শোনা যায়:
“সব খোল, সব খোল, এই মাস্ক খোল, ঢাকবি না, ঢাকলে কিন্তু মাইর হবে।”
এ সময় আটক নারীদের অনুনয়-বিনয় করতে ও কাঁদতে দেখা গেলেও শারীরিক বলপ্রয়োগ করে তাঁদের চেহারা ক্যামেরার সামনে উন্মুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে এসব সংবেদনশীল ভিডিও ইউটিউব ও বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে ছড়িয়ে পড়ে।
অভিযানে উপস্থিত ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির আটক ব্যক্তিদের জোরপূর্বক মুখ দেখানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, আটক ব্যক্তিদের প্রাথমিক পরিচয় নিশ্চিত করতে মাস্ক বা ওড়না সরানোর কথা বলা হতে পারে।
তবে ভিডিওতে সরাসরি বলপ্রয়োগের চিত্র দৃশ্যমান থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুলত্রুটি ঘটতে পারে, কারণ পুলিশ কোনো ফেরেশতা নয়। এছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভিউ’ পাওয়ার উদ্দেশ্যে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও কিছু সংবাদমাধ্যম এসব প্রচার করেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, আদালতের রায়ে অপরাধী প্রমাণিত হওয়ার পূর্বে কোনো নাগরিককে জনসম্মুখে লাঞ্ছিত বা হেয়প্রতিপন্ন করা বেআইনি।
সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ: দেশের সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাদায়ক আচরণ করা যাবে না। হাইকোর্টের নির্দেশনা (২০১২): হাইকোর্ট ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর এক ঐতিহাসিক নির্দেশনায় স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, গ্রেপ্তার বা সন্দেহভাজন হিসেবে আটক যেকোনো ব্যক্তিকে গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন বা প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। জাতিসংঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২(১) ও ৪: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি অনুযায়ী আটক ব্যক্তিদের প্রতি অমানবিক বা অপমানজনক আচরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান জানান, কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে আদালত তথ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে বিচার করবেন; কিন্তু পুলিশ বিচারের আগেই একধরনের সামাজিক শাস্তির আয়োজন করছে, যা আইনত দণ্ডনীয় ও অগ্রহণযোগ্য।
সংবাদ বিশ্লেষকদের মতে, অভিযানে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইউটিউবারদের ডেকে নেওয়ার প্রবণতা নীতিগতভাবে ভুল। আইনশৃঙ্খলার কাজ শেষে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের সুযোগ থাকলেও, অভিযানে ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের যুক্ত করে অনৈতিক ‘ভিউ বাণিজ্য’ চালানো হচ্ছে, যা নাগরিকদের গোপনীয়তা ও মানবাধিকারকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।