বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট রোডম্যাপ ২০৩০ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান
সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনা, সরকারি দলের ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’ এবং বিরোধী দলের প্রস্তাবিত যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের আলোচিত ও সমালোচিত ১৮(ক) ধারাটি বিলুপ্ত করে জাতীয় সংসদে সংশোধনী বিল পাস হওয়া দেশের ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক আর্থিক সুশাসনের জন্য একটি অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। একীভূত হওয়া কিংবা পুর্নগঠনের আওতায় আসা ব্যাংকের পুরোনো, বিতর্কিত ও খেলাপি পরিচালকদের পুনরায় মালিকানায় বা পরিচালনা পর্ষদে ফেরার সুযোগ রেখে সংশোধনীটি আনা হয়েছিল।
এর ফলে ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের লুটপাট, দুর্নীতি ও আমানতকারীদের জমানো অর্থের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অবশেষে ব্যাপক জনমত, অর্থনীতিবিদদের সমালোচনা এবং সংসদীয় আলোচনার মুখে সরকার এই বিতর্কিত ধারাটি বিলুপ্ত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক ও নীতিগত নমনীয়তার উদাহরণ।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ম এবং দুর্বল তদারকির কারণে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও অর্থনীতিবিদদের পরামর্শে ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, যেখানে দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে পুনর্বাসন বা একীভূত করার আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়।
কিন্তু বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ধারা ১৮(ক) সংযোজনের মাধ্যমে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যার ফলে যেসব পরিচালক বা শেয়ারধারকদের অনিয়ম ও ব্যর্থতার কারণে একটি ব্যাংক দেউলিয়া বা ধ্বংসের মুখে পড়েছিল, তারাই আবার ঘুরেফিরে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলেন।
আইনবিদ ও আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল ব্যাংকিং খাতে জালিয়াতি ও অসদাচরণকে এক ধরনের আইনি বৈধতা দেওয়ার সামিল।
সংসদে বিলটির উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উল্লেখ করেছেন যে, আইনটি কার্যকর হওয়ার পর উক্ত ধারার পূর্ণ শর্ত পরিপালন করে ইতিমধ্যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় এটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। যুক্তির খাতিরে এই বাস্তবিক চিত্র স্বীকার করলেও, আসল সত্য হলো এই ধারার অস্তিত্বই ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ আমানতকারী ও বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর আস্থা সম্পূর্ণভাবে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছিল। কোনো ব্যাংক যখন অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন তার শেয়ারহোল্ডারদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার বদলে পুনরায় একই ব্যক্তিবর্গকে ফিরে আসার আইনি গ্যারান্টি দেওয়া কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক ভালো অনুশীলনের (International Best Practice) অংশ হতে পারে না।
সংসদে এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও অনাকাঙ্ক্ষিত হট্টগোল হলেও দিনশেষে বিলুপ্তির এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আইনি ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তবে কেবল একটি বিতর্কিত ধারা বাতিল করাই শেষ কথা নয়; দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে, আমানতকারীদের অর্থ কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে এবং যেসব খেলাপি ও বিতর্কিত পরিচালক ব্যাংকগুলোকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন তাদের বিরুদ্ধে কী শাস্তিমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর ও স্পষ্ট নীতি গ্রহণ করতে হবে।
ব্যাংকিং খাত হলো একটি দেশের অর্থনীতির মূল রক্ত সঞ্চালনকারী ধমনী, এখানে কোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা রাজনৈতিক সুবিধা প্রদানের সুযোগ রাখা হলে তা পুরো অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে। ১৮(ক) ধারা বিলুপ্তির মাধ্যমে যে সুবুদ্ধির পরিচয় মিলেছে, তা ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের ব্যাংকিং খাত গড়ে তোলার যাত্রায় অব্যাহত থাকবে বলেই প্রত্যাশা।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।