ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন: চার সিঁড়িতে তালা
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনে অগ্নিকাণ্ডের সময় পাঁচটি সিঁড়ির চারটিতে তালা ছিল। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, এতে আতঙ্ক ও ভোগান্তি বেড়ে যায়।
ঢাকা: সরকারের কাছ থেকে বিনা সুদে ঋণ নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। তাঁদের কেউ কেউ গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা করে সরকারি ভাতাও নিচ্ছেন। অথচ একই সময়ে এলজিইডির গাড়ি, চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধাও ভোগ করছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এলজিইডির প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহারের তালিকায় স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বগুড়া সিটি করপোরেশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তার নাম রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য কেনা গাড়ি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজেই ব্যবহারের কথা। প্রকল্প শেষ হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সচল গাড়ি সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে প্রকল্পের গাড়ি দিয়ে মন্ত্রণালয় বা অন্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নিয়মিত যাতায়াত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মনিরুল ইসলাম চার বছর আগে সরকারের কাছ থেকে বিনা সুদে ঋণ নিয়ে গাড়ি কেনেন। সেই গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা সরকারি ভাতাও পান তিনি।
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, মনিরুল ইসলাম নিয়মিতভাবে এলজিইডির একটি স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিকেল (এসইউভি) ব্যবহার করেন। গাড়িটির চালক সরকারি এবং জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও সরকার বহন করে।
মনিরুল যে এসইউভি ব্যবহার করেন, সেটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান ‘প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজ’ প্রকল্পের গাড়ি। এলজিইডির এমন প্রকল্পের গাড়ি বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
মনিরুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, শুধু স্থানীয় সরকার বিভাগ নয়, অন্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করেন। তাঁর ভাষ্য, তাঁকে দেওয়া গাড়িটি নির্ধারিত নয়; তিনি মাঝেমধ্যে সেটি ব্যবহার করেন। আর বিনা সুদে নেওয়া গাড়িটি তিনি নিজে এবং পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন।
একইভাবে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ খানও এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তিনিও সরকারি বিনা সুদের ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন এবং মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা পান। একই সঙ্গে দুটি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে চাননি।
এলজিইডি গ্রামীণ অবকাঠামো, রাস্তা, সেতু, কালভার্ট ও হাটবাজারসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এলজিইডির ১১৯টি প্রকল্প রয়েছে।
এলজিইডির প্রকল্পে মোট কতটি গাড়ি রয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ২৬১টি গাড়ির একটি তালিকা পাওয়া গেছে। তালিকা অনুযায়ী, এর মধ্যে ২১১টি এসইউভি, ৪১টি ডাবল কেবিন পিকআপ এবং ৯টি কার।
এই ২৬১টি গাড়ির মধ্যে ২১১টি এলজিইডির কর্মকর্তারা ব্যবহার করেন। তালিকায় এমন কর্মকর্তার নামও রয়েছে, যাঁরা গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকারভুক্ত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে ৫৯টি গাড়ি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাকে দিয়েছে এলজিইডি।
প্রাপ্ত তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ২৬টি এলজিইডির গাড়ি রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে রয়েছে আরও আটটি। অর্থাৎ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মিলিয়ে ৩৪টি গাড়ি রয়েছে।
এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনে ১০টি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ছয়টি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তিনটি, প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তিনটি, বগুড়া সিটি করপোরেশনে দুটি এবং দুদকে একটি গাড়ি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি গাড়ি ‘স্ট্যান্ডবাই’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তালিকায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, তাঁদের দপ্তর ও নিরাপত্তার কাজে গাড়ি বরাদ্দের তথ্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ছয়টি গাড়ির ব্যবহারকারী হিসেবে প্রসিকিউটরদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, প্রসিকিউটররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। তাঁদের নিরাপত্তার জন্য গাড়িতে চলাচল প্রয়োজন। এ কারণে সরকারি সংস্থা থেকে গাড়ি নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের কাছে এলজিইডির ১০টি গাড়ি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নয়টি নির্দিষ্ট কর্মকর্তারা ব্যবহার করেন। একটি ‘স্ট্যান্ডবাই’ হিসেবে রাখা হয়েছে।
এলজিইডির গাড়ি ব্যবহারকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, বিভাগীয় প্রধান, যুগ্ম সচিব ও উপপ্রধান পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
পরিকল্পনা কমিশনের বিভাগীয় প্রধান কবির আহামদ বলেন, তাঁরা প্রকল্প দেখার জন্য গাড়ি ব্যবহার করেন এবং প্রকল্পের কাজেই গাড়ি নেওয়া হয়।
তবে প্রকল্প যাচাই ও অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয় কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রধান মো. বাবুল মিঞাও এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করেন। তাঁর বক্তব্য, গাড়িটি অফিসিয়াল কাজে ব্যবহার করা হয় এবং অফিসিয়াল কাজের বাইরে ব্যবহার করা হয় না।
প্রকল্পের গাড়ি এভাবে ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি একা তো ব্যবহার করছি না।’
অনুসন্ধানে ৩৫ জন কর্মকর্তার নাম পাওয়া গেছে, যাঁরা সরকারের বিনা সুদের ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন এবং একই সঙ্গে মাসিক ৫০ হাজার টাকা করে রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা পান। তাঁদের কয়েকজন আবার এলজিইডির প্রকল্পের গাড়িও ব্যবহার করছেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের বিনা সুদে গাড়ি কেনার ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা শুরু হয় ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে। সে সময় বলা হয়েছিল, সরকারি গাড়ি ব্যবহারের প্রাধিকার পাওয়া কর্মকর্তাদের সবাইকে পরিবহন পুল থেকে গাড়ি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে বিকল্প হিসেবে সুদমুক্ত গাড়ি ঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা চালু করা হয়।
নীতিমালা অনুযায়ী, কর্মকর্তারা ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনা সুদে ঋণ পেতে পারেন। এর সঙ্গে ১ শতাংশ সার্ভিস চার্জ রয়েছে।
অন্যদিকে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। অর্থাৎ সরকারি ঋণে গাড়ি কেনার পাশাপাশি গাড়ি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি অর্থের সুবিধা পাচ্ছেন কর্মকর্তারা।
গত ৯ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা ৫০ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকায় নামিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে বলেছিল। তবে কর্মকর্তাদের আপত্তির মুখে ১৬ জুলাই সেই উদ্যোগ বাতিল হয়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ হাজার ৩৫৭ জন কর্মকর্তা বিনা সুদের গাড়িঋণ নিয়েছেন। গত ২ এপ্রিল বিএনপি সরকার গাড়িঋণ দেওয়া স্থগিত করে।
প্রকল্পের গাড়ি প্রকল্পের বাইরের কাজে ব্যবহার করা নিয়ে প্রশ্নের মূল কারণ হলো সরকারি বিধি। নিয়ম অনুযায়ী, প্রকল্পের গাড়ি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজেই ব্যবহার করতে হবে। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সচল গাড়ি ৬০ দিনের মধ্যে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
তবে গত পাঁচ বছরে শেষ হওয়া এলজিইডির প্রকল্পগুলোর কতটি গাড়ি পরিবহন পুলে জমা দেওয়া হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থা থেকে গত চার বছরে মাত্র ১৮টি গাড়ি জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন বলেন, পরিকল্পনা কমিশন ও দুদককে গাড়ি দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে মন্ত্রণালয়ে এলজিইডির কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করেন।
প্রকল্পের গাড়ি প্রকল্পের বাইরের কেউ ব্যবহার করতে পারেন কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, কাজের প্রয়োজনে যখন যেখানে দরকার সেখানে এলজিইডির গাড়ি দেওয়া হয়েছে।
সরকারি গাড়ি ব্যবহারের এই প্রবণতাকে ‘যোগসাজশমূলক অনিয়ম’ হিসেবে দেখছেন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এলজিইডি যেমন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে, তেমনি যাঁরা গাড়ি ব্যবহার করছেন, তাঁরাও নিয়ম মানছেন না।
তাঁর মতে, এলজিইডি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা এবং বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কমিশনের ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে দুদক দুর্নীতি দমনের দায়িত্বে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা এলজিইডির গাড়ি ব্যবহার করলে পারস্পরিক সুবিধা ও সুরক্ষার প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এলজিইডির গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। সাবেক স্থানীয় সরকার সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে একাধিক গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, একটি গাড়ি তিনি নিজে ব্যবহার করেন, একটি পরিবার ব্যবহার করে এবং আরেকটি বিকল্প হিসেবে থাকে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, কোনো অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলে এলেই তা বৈধ হয়ে যায় না।
সরকারি কর্মকর্তাদের প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার বন্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকেও বিভিন্ন সময়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছিল, সুদমুক্ত গাড়িঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের বিধিবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ব্যবহারের কারণে জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক অপচয় হচ্ছে।
তারপরও এই ব্যবস্থার কার্যকর পরিবর্তন হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, রাজনৈতিক সরকার শক্ত অবস্থান নিলেই এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব।