হাম উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু, নতুন রোগী ১ হাজার ৩৪৯
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৪৯ জন।
ঢাকা: হামের টিকাদান কর্মসূচিতে ২০২০ সালের পর দীর্ঘ সময়ের ঘাটতির কারণে দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর দাবি, আগের সরকারের সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে তৈরি হওয়া ঘাটতির ‘খেসারত’ বর্তমান সরকারকে দিতে হয়েছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বনানীর কড়াইল টিএনটি খেলার মাঠে দ্বিতীয় দফার বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়া শিশুদের সুরক্ষায় দেশজুড়ে শুরু হওয়া এ কর্মসূচিতে ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্যাম্পেইন চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় সরকারের নিয়মিত নজরদারি ও টিকাদান কর্মসূচি চালু রাখা জরুরি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের পর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাপকহারে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি ছিল।
টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। সাখাওয়াত হোসেনের দাবি, ইউনিসেফের সহযোগিতায় সরাসরি কেনাকাটার পরিবর্তে আগের সরকার উন্মুক্ত দরপত্রের পথে যেতে চাওয়ায় টিকা সংগ্রহে সময়ক্ষেপণ হয়েছিল। তাঁর মতে, এতে কয়েক বছরের ঘাটতি তৈরি হয় এবং পরে বর্তমান সরকারকে তা পূরণে অতিরিক্ত উদ্যোগ নিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে অনেক পরিবারকে কষ্ট পেতে হয়েছে এবং হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় এক হাজারের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১ কোটি ৮৫ লাখ ৮৩৩ শিশুকে টিকা দেওয়ার কার্যক্রমের পরও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি বছরের এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়। ইউনিসেফ, গ্যাভি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত ওই কর্মসূচিতে নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় ১০২ থেকে ১০৪ শতাংশ পর্যন্ত অর্জন হয়েছে বলে তিনি জানান।
এরপরও টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করতে মপ-আপ কার্যক্রম চালানো হয়। এ সময় আরও প্রায় ১৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ভিটামিন এ ক্যাপসুল কর্মসূচির তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে টিকা না পাওয়া শিশুদের একটি অংশ শনাক্ত করা হয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন ক্যাচ-আপ কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী যেসব শিশু আগের হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনে টিকা পায়নি বা বাদ পড়েছে, তাদের খুঁজে টিকা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ছয় মাস বয়স পূর্ণ করা শিশুদেরও কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
এবার মোট ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর ইউনিসেফের কাছ থেকে আরও ৪৩ লাখ ডোজ টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। আগের মজুতসহ পর্যাপ্ত টিকা রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির কারণে রোগের জটিলতা বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, নিউমোনিয়া ও অপুষ্টি হামে আক্রান্ত শিশুদের গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
তিনি জানান, অপুষ্টির কারণে অনেক শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে। ফলে হাম হলে তারা দ্রুত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অবস্থায় চলে যেতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে আইসিডিডিআরবির চিকিৎসক চিশতির উদ্ভাবিত কম খরচের বোতলভিত্তিক সিপ্যাপ পদ্ধতি ব্যবহার করে শ্বাসকষ্টে থাকা কিছু শিশুকে অক্সিজেন সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দ্বিতীয় দফার কর্মসূচিতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে টিকাদান ক্যাম্প পরিচালনা করা হবে। উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসন, সিভিল সার্জন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
কর্মজীবী মায়েদের কথা বিবেচনা করে ছুটির দিনেও টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সন্ধ্যার পরও টিকাদান কার্যক্রম চালানোর কথা জানিয়েছেন তিনি।
৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে এই ক্যাম্পেইনের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। কর্মসূচি সফল করতে গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতাও চেয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।