সীমান্তের বাইরে ‘বন্ধু ও অংশীদার, কোনো প্রভু নয়’: এক আত্মমর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতির পদধ্বনি
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু থাকে না, থাকে কেবল স্থায়ী জাতীয় স্বার্থ। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এই চিরন্তন সত্যটি বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বিশেষ কোনো দেশের রাজনৈতিক সুনজরে থাকাকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, শুক্রবার (৫ জুন) ঢাকায় সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা—দেশের সীমান্তের বাইরে রয়েছে “বন্ধু ও অংশীদার, কোনো প্রভু নয়”—এক নতুন ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের বার্তাবহ। এই একটি মাত্র বাক্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, বাংলাদেশ আর কোনো পরাশক্তির প্রভাববলয়ে থেকে অন্ধ অনুকরণ করবে না, বরং সমমর্যাদার ভিত্তিতে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক পরিচালনা করবে।
সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রধান পররাষ্ট্রনীতি “বাংলাদেশ প্রথম” (Bangladesh First)-এর যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যৌক্তিক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে অনুসৃত এই নীতির মূল কথাই হলো—যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি, দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা বহুপাক্ষিক জোটে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণকে সবার উপরে স্থান দেওয়া হবে।
অনেকে এই নীতিকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ বা ‘একলা চলো’ নীতির সাথে গুলিয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত সুচারুভাবে পরিষ্কার করেছেন যে, ‘বাংলাদেশ প্রথম’ মানে বিশ্ব থেকে একা হয়ে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ এখন থেকে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে গঠনমূলক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলার নীতিতে অগ্রসর হচ্ছে।
তবে এই সম্পর্ক হবে সম্পূর্ণ সমমর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ কারো একক প্রভাবাধীন বা নতজানু হয়ে কোনো জোটে পা দেবে না—এই দৃঢ় অবস্থানই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের আসল পরিচয়।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের এই ঢাকা সফর এবং তাঁর সাথে যৌথ সংবাদ সম্মেলন প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক বলয়কে কেবল আঞ্চলিক গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং মুসলিম বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর সাথে কৌশলগত অংশীদারত্ব বাড়াচ্ছে।
তুরস্কের মতো একটি সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে উদীয়মান বৈশ্বিক শক্তির সাথে বাংলাদেশের এই ঘনিষ্ঠতা প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি খাতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে। এটিও বর্তমান সরকারের “বাংলাদেশ প্রথম” নীতির একটি বড় সাফল্য, যেখানে সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো ‘পারস্পরিক অংশীদারত্ব’, কোনো একতরফা প্রভাব নয়।
বর্তমান বিশ্ব যখন বহুমুখী মেরুকরণ, অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক সংঘাতে জর্জরিত, তখন বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের নবনির্বাচিত সভাপতি ড. খলিলুর রহমান যেভাবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নেতৃত্বকে সুসংহত করছেন, তাতে স্পষ্ট যে বাংলাদেশ এখন আর বৈশ্বিক রাজনীতিতে কেবল একজন ‘দর্শক’ নয়, বরং একজন ‘গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারক’। সমমর্যাদার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার এই নীতি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও দরকষাকষির ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নির্দেশনা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের বলিষ্ঠ কূটনৈতিক প্রজ্ঞায় দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তা এ দেশের ১৭ কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। “প্রভু নয়, বন্ধু ও অংশীদার”—এই দর্শনকে বুকে ধারণ করে বাংলাদেশ যদি তার অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কগুলো এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তবে বৈশ্বিক যেকোনো সংকটেই আমাদের জাতীয় স্বার্থ থাকবে অক্ষুণ্ন।
আমরা আশা করব, বর্তমান সরকার এই আত্মমর্যাদাশীল ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির ওপর অটল থাকবে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাকে এক নতুন এবং সুদৃঢ় উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।