ঢাকা আজ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল ও যানজটপ্রবণ শহর। এই অমানবিক যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দীর্ঘকাল ধরেই শহরের অভ্যন্তরে অবস্থিত আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলোকে দায়ী করা হয়। সায়দাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী—এই তিনটি বড় টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার বাস শহরের সরু রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করার ফলে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থা কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েছে। এই সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি এই টার্মিনালগুলো ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার যে চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছেন, তা এক কথায় নির্ভীক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
তথাকথিত ‘পরিবহন মাফিয়া’ বা স্বার্থান্বেষী মহলের চাপের কাছে মাথা নত না করে জনস্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, একটি পরিকল্পিত ঢাকা গড়ার প্রশ্নে সরকার আপসহীন।
টার্মিনালগুলো যখন শহরের প্রান্তসীমায় বা শহরের বাইরে হেমায়েতপুর, কাঁচপুর কিংবা কামরাঙ্গীরচরের মতো নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তরিত হবে, তখন রাজধানীর অভ্যন্তরে যানজট অবিশ্বাস্যভাবে লাঘব হবে।
আন্তঃজেলা বাসগুলো আর শহরের ভেতরের সড়কগুলো দখল করতে পারবে না, যার ফলে সাধারণ যানবাহনের গতি বাড়বে।
যানজটে আটকে থেকে মানুষের যে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, তা বেঁচে যাবে, যা সরাসরি জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
দীর্ঘ সময় জ্যামে বসে থাকার ফলে সৃষ্ট মানসিক অবসাদ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমবে, যা নাগরিকদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করবে।
শুধুমাত্র বাস টার্মিনাল সরানোই যথেষ্ট নয়, বরং ঢাকার ওপর মানুষের চাপ কমাতে দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কোণ বা প্রান্তের সাথে দ্রুতগতির ট্রেন যোগাযোগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত হাই স্পিড ট্রেন চালু করা হলে যাতায়াতের সময় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে।
দ্রুতগতির রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে মানুষ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে বসবাস করে মাত্র ৩০-৪০ মিনিটে ঢাকায় এসে কাজ করতে পারবে। এর ফলে ঢাকার ওপর থেকে অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যার চাপ কমে যাবে।
ঢাকার ভেতর থেকে বাস টার্মিনাল অপসারণ এবং রেলের আধুনিকায়ন ঢাকাকে একটি ‘চমৎকার বসবাসের নগরী’ হিসেবে পুনর্জন্ম দেবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ কেবল একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়, বরং এটি তিলোত্তমা ঢাকা গড়ার একটি ব্লু-প্রিন্ট। এই সাহসী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে পরিবহন মালিক বা শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে আসা যেকোনো বাধা সরকারকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে।
বাস টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে চলে গেলে এবং রেল যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হলে ঢাকা হয়ে উঠবে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও সুশৃঙ্খল মেগাসিটি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই প্রশংসনীয় উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই এবং এর দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করি।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।