ইতালিতে উচ্চ বেতনে চাকরি ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে জাল শেনজেন ভিসার মাধ্যমে মানব পাচারের অভিযোগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেপ্তারকৃত কর্মকর্তার নাম মোহাম্মদ আখলাছুর রহমান, যিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জুনিয়র অফিসার (গ্রাউন্ড সার্ভিস, আইএনএস গেট) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
গতকাল মঙ্গলবার গভীর রাতে জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার নিলক্ষীয়া বাজার এলাকায় এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে সিআইডির একটি দল তাঁকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃত আখলাছুর রহমানের গ্রামের বাড়ি জামালপুরে হলেও তিনি ঢাকার দক্ষিণখানের আশকোনা এলাকায় বসবাস করতেন। আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার বদরুল আলম মোল্লা।
সংবাদ সম্মেলনে সিআইডি জানায় যে, এই আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রটি ইতালিতে পাঠানোর নাম করে দুই ব্যক্তির সঙ্গে জনপ্রতি ৩০ লাখ টাকার চুক্তি করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী ভুক্তভোগীরা অগ্রিম হিসেবে ২০ লাখ টাকা করে মোট ৪০ লাখ টাকা চক্রের সদস্যদের হাতে তুলে দেন। এরপর চক্রটি ওই দুই যাত্রীকে নেপাল ও ইতালিগামী বিমানের টিকিট, বোর্ডিং পাস এবং ইতালির জাল শেনজেন ভিসা সরবরাহ করে।
গত ২৬ মে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে ওই দুজন ইতালির উদ্দেশে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। তবে ইতালির রোমে অবস্থিত লিওনার্দো দা ভিঞ্চি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর দেশটির ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে তাঁদের পাসপোর্টে থাকা শেনজেন ভিসাটি জাল বলে শনাক্ত করে। সেখানে তাঁদের দুই দিন হেফাজতে রাখার পর গত ২৮ মে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
দেশে ফেরার পর ঢাকার ইমিগ্রেশন পুলিশ, সিআইডি এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ জিজ্ঞাসাবাদে ভুক্তভোগীরা তাঁদের সঙ্গে ঘটা এই ভয়াবহ জালিয়াতির বিবরণ দেন। বৈধ কর্মসংস্থানের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাল ভিসা সরবরাহের মাধ্যমে তাঁদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলা এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগে গত ৩০ মে রাজধানীর বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।
এই মামলার সূত্র ধরে সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ দল তদন্তে নামে এবং বিমান কর্মকর্তা মোহাম্মদ আখলাছুর রহমানের সরাসরি জড়িত থাকার তথ্য প্রমাণ পায়। বিমান কর্মকর্তা হিসেবে নিজের পদের অপব্যবহার করে তিনি বিমানবন্দরে জাল ভিসাধারী যাত্রীদের পারাপারে ব্যাকডোর সহায়তা দিয়েছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার বদরুল আলম মোল্লা বলেন যে, এই চক্রের মূল হোতা এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সহযোগীদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য সিআইডির একাধিক টিম কাজ করছে। এই জালিয়াতি চক্রের শিকড় অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এর সঙ্গে বিমানবন্দরের আর কেউ জড়িত আছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একই সঙ্গে সিআইডির পক্ষ থেকে জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে যেন কেবল সরকার অনুমোদিত বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ও সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। কোনো প্রকার দালাল বা অবৈধ চক্রের খপ্পরে না পড়ে এবং জাল ভিসা বা অবৈধ অভিবাসন সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য জানা থাকলে তা দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করেছে সিআইডি।