যমুনা নদীর তীরে নতুন দুই নদীবন্দর: উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি ও নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগের নতুন দিগন্ত
বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও ধুনটে নতুন অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর ঘোষণা, যমুনা নদীকেন্দ্রিক পরিবহন, বাণিজ্য ও উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।
বাংলাদেশ ও ভারতের ভূ-রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের গতিপথ চিরকালই অনন্য। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ভারতে অবস্থানরত মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে অনলাইনে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে দেওয়ার প্রেক্ষাপটে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে অনাকাঙ্ক্ষিত সাময়িক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে—তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
এ মাসের শেষভাগে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করার পর, পুরো কূটনৈতিক মহলের চোখ এখন আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফরের দিকে।
দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের এই সম্ভাব্য বৈঠক কেবল সাম্প্রতিক কূটনৈতিক শীতলতা কাটানোর পথই উন্মোচন করবে না, বরং জাতীয় স্বার্থ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দেবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যথার্থই তুলে ধরেছেন যে, যেকোনো সংকটে যখন দুই দেশের শীর্ষ প্রধানগণ সরাসরি সংলাপে বসেন, তখন বহু জটিল রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক সমস্যার পথ উন্মুক্ত হয়। ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর দিল্লিতে সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা এবং ঢাকায় ফিরে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাথে বৈঠক করার তোড়জোড় ইঙ্গিত দেয় যে, উভয় রাষ্ট্রই একটি স্থিতিশীল ও সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে ইতিবাচক।
একটি সার্বভৌম ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই উচ্চপর্যায়ের ভারত সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ট্রানজিট বাণিজ্য ও জ্বালানি স্থায়িত্বের স্বার্থে প্রতিবেশী দেশের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের কোনো বিকল্প নেই। এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর ও দ্বিপক্ষীয় মৌলিক সমস্যার টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে পারে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের রক্তের দাগ এখনো তাজা। সাজাপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনা ভারতের মাটিতে অবস্থান করে রাজনৈতিক বক্তব্য বা বিবৃতি প্রদান করলে তা বাংলাদেশের আপামর জনগণের হৃদয়ে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ভারতীয় পক্ষকে এই সংবেদনশীলতার বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করানো এবং আইনি কাঠামোর আওতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দ্রুত হস্তান্তরের কার্যকর বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
কয়েক দশক ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি সই, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন এবং সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর অহেতুক গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানি বন্ধের শতভাগ গ্যারান্টি আদায় করা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হতে হবে। ‘জিরো বর্ডার কিলিং’ নীতির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, বাংলাদেশি পণ্যের ওপর থেকে অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি ও শুল্ক বাধা অপসারণ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে সংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ট্রানজিট সুবিধার বিপরীতে ন্যায্য রাজস্ব আদায় সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় মর্যাদা ও দেশের সুনির্দিষ্ট স্বার্থ সর্বাগ্রে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কর্মসূচি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংসদ অধিবেশনের শত ব্যস্ততার মধ্যেও ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক পথ উন্মুক্ত রাখা প্রজ্ঞাপূর্ণ রাজনীতির পরিচয়।
নয়াদিল্লির দিক থেকেও উচিত হবে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে একটি রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির সম্পর্ক অতিক্রম করে বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর বন্ধু হিসেবে নিজেদের অবস্থান পুনর্প্রতিষ্ঠা করা। পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সম্ভাব্য সফর দুই দেশের ঐতিহাসিক সুসম্পর্কে এক নতুন ও সোনালী অধ্যায়ের সূচনা করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাস্ট্রচিন্তক।