বাংলাদেশে সাম্প্রতিক অবাধ ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত নির্বাচনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং ইইউ-এর কৌশলগত অর্থনৈতিক অবস্থান বাংলাদেশকে এক গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে এনে দিয়েছে।
ঐতিহ্যগত অনুদাননির্ভর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে যৌথ অর্থায়ন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ঘোষণা দু’পক্ষের দীর্ঘমেয়াদি ও সমতার ভিত্তিতে তৈরি অংশীদারিত্বের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
একই সাথে একক কোনো বৈশ্বিক শক্তির ওপর অর্থনৈতিক বা ঋণনির্ভরতা না বাড়িয়ে ভাগাভাগি সমৃদ্ধি ও ন্যায্যতার ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যাওয়ার যে পরামর্শ রাষ্ট্রদূত দিয়েছেন, তা আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশল ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণ বা গ্যাজুয়েশনের পর বৈশ্বিক বাজারে বাণিজ্য সুবিধা অক্ষুণ্ন রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইইউ রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যে কৌশলগত রূপরেখা তুলে ধরেছেন, তা দেশের অবকাঠামোগত ভিত্তি মজবুত করতে সহায়ক হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রধান গেটওয়ে। এখানে আধুনিকায়ন ও বন্দর নিরাপত্তায় ইইউর সহযোগিতা আমাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলকে নতুন গতি দেবে। বর্তমানে চলমান প্রায় ১ বিলিয়ন ইউরোর প্রকল্প ও অনুদানের পাশাপাশি প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যা আমাদের অর্থনীতিকে আরও টেকসই ও বহুমুখী করবে।
অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি সম্পর্কে রাষ্ট্রদূতের সতর্কতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশকে এমন অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে যেখানে দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকে।
ইইউ রাষ্ট্রদূত ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ইউরোর বেশি সহায়তা দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নতুন গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রেখে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই নতুন গতিকে কাজে লাগানোই এখন বাংলাদেশের প্রধান কৌশল হওয়া উচিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো নির্ভরযোগ্য ও বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদারের সাথে কেবল সাহায্য-ভিত্তিক নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রক্রিয়া বাংলাদেশকে আগামী দিনে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শক্ত ভিত দেবে।
বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান ধরে রেখে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করাই সময়ের দাবি।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।