ঢাকা: অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে বিচারিক নিলামে বিক্রিত সম্পত্তির ওপর মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত বিষয়ে পূর্বে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে বিচারপতি সরদার রাশেদ জাহাঙ্গীর ও বিচারপতি জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। এই রায়ের ফলে এখন থেকে নিলামে বিক্রিত সম্পত্তির ওপর ভ্যাট আদায়ের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা থাকছে না।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার সাকিব মাহবুব।
আদালত সূত্রে জানা যায়, একটি বন্ধকি ঋণ আদায়ের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ঢাকার অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে অর্থঋণ জারি মামলার প্রেক্ষিতে অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ৩৩(১) ধারার অধীনে একটি বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে তোলা হয়। ওই নিলামে আবেদনকারীরা ২৪ কোটি টাকা সর্বোচ্চ দর দিয়ে সম্পত্তিটি ক্রয় করেন এবং আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সমুদয় অর্থ পরিশোধ করেন। এরপর আদালত পাউন্ডেজ ফি গ্রহণের পর নিলামমূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও প্রয়োজনীয় স্ট্যাম্প ডিউটি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
নিলাম ক্রেতা ও ডিক্রিদার ব্যাংক উভয়েই আদালতের ওই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেন। পূর্বের কয়েকটি রায়ের আলোকে ব্যাংককে ১৫ শতাংশ ভ্যাট থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও নিলাম ক্রেতাদের আবেদন খারিজ করে তাঁদের ওপর ভ্যাট ও স্ট্যাম্প ডিউটি পরিশোধের নির্দেশ বহাল রাখা হয়। এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করেন ক্ষুব্ধ নিলাম ক্রেতারা। গত ৮ এপ্রিল হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল নিসি জারি করে নির্দেশের কার্যকারিতা স্থগিত করেন।
গত ১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি সরদার রাশেদ জাহাঙ্গীর ও বিচারপতি জিয়াউল হকের বেঞ্চে রুল ও সম্পূরক রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। রিটকারীদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমান খান, ব্যারিস্টার সাকিব মাহবুব ও অ্যাডভোকেট সাজিদ হাসান। অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার তানিম খান। উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত রুল যথাযথ ঘোষণা করেন।
হাইকোর্টের রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নিলাম ক্রেতা হিসেবে আবেদনকারীদের নিলামমূল্যের ওপর উৎসে ১৫ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধের নির্দেশ দিয়ে অর্থঋণ আদালতের দেওয়া আদেশটি সম্পূর্ণ আইনি কর্তৃত্ববহির্ভূত। একইসঙ্গে আদালত ঘোষণা করেন, বিতর্কিত এসআরও-এর যে অংশে স্থাবর সম্পত্তির ক্রেতাকে পণ্যের নিলাম ক্রেতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সে অংশটুকুও আইনি কার্যকারিতাহীন।
আইনজীবীদের মতে, এই রায়ের ফলে অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে বিচারিক নিলামে ক্রয় করা স্থাবর সম্পত্তির মূল্যের ওপর আর ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে না, যা দেশের আইনি অঙ্গনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নজির স্থাপন করল। পাশাপাশি আদালত এই নীতিও স্পষ্ট করেছেন যে, সংসদ যদি কোনো সম্পত্তির বিক্রয় বা হস্তান্তরকে আইনগতভাবে ভ্যাট থেকে অব্যাহতি দেয়, তবে কেবল অধস্তন বা অর্পিত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নতুন করে করের বোঝা চাপানো যায় না। এই রায় দেশের বিভিন্ন অর্থঋণ আদালতে ডিক্রি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও নিলাম কার্যক্রমে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।