জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রায় উপকূলে সনাতন চিংড়ি চাষ ব্যাহত হলেও এর টেকসই সমাধান হতে পারে ‘ম্যানগ্রোভভিত্তিক সমন্বিত চিংড়ি চাষ’। এ পদ্ধতিতে চিংড়ির ওপর তাপমাত্রার ক্ষতিকর প্রভাব কমে এবং উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি কাঠামোগত নীতি প্রণয়ন ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
গতকাল বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দৈনিক প্রথম আলো কার্যালয়ে সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলে সমন্বিত ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে পরিবেশ, মৎস্য ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন।
গোলটেবিলে ম্যানগ্রোভভিত্তিক মৎস্য চাষের ওপর মূল গবেষণা তথ্য উপস্থাপন করেন এক্সেমপ্লেরি কনসাল্টিংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুল আজম।
সনাতন পদ্ধতিতে চিংড়ির গড় মৃত্যুহার ৬৪ শতাংশ, যা ম্যানগ্রোভভিত্তিক চাষে কমে ৫০ শতাংশে নেমে আসে। খুলনার পাইকগাছায় ১০০ হেক্টর জমিতে পরীক্ষামূলক প্রয়োগে এ ইতিবাচক সাফল্য মিলেছে। আগামী ২০ বছরের মধ্যে উপকূলে প্রায় ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে ম্যানগ্রোভভিত্তিক পদ্ধতিতে অর্গানিক চিংড়ি চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
ছায়া, প্রাকৃতিক খাদ্য ও অর্গানিক চিংড়ি রপ্তানি
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বনাঞ্চলকে সুরক্ষিত রেখে বাইরে নিজস্ব ঘেরে এ চাষ সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, ঘেরের বেড়িবাঁধে ম্যানগ্রোভের চারা রোপণ করলে তা একদিকে তাপপ্রবাহে মাছকে ছায়া দেবে, অন্যদিকে পাতা পচে প্লাংকটনের জোগান বাড়িয়ে প্রাকৃতিক খাদ্যের আধার তৈরি করবে। এতে কীটনাশক ও সারের ব্যবহার কমে গিয়ে অর্গানিক ‘হাই ভ্যালু’ পণ্য হিসেবে চিংড়ির রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মো. লতিফুল ইসলাম বলেন, “একসময় রপ্তানি পণ্যের দ্বিতীয় স্থানে থাকা চিংড়ি এখন চতুর্থ বা পঞ্চম স্থানে নেমে গেছে। চিংড়ি শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে মৎস্য, বন ও পরিবেশ দপ্তর এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে জোনিং (শোভন অঞ্চল নির্ধারণ) করে প্রযুক্তিবান্ধব উদ্যোগ নেওয়া দরকার।”
সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার কান্ট্রি ম্যানেজার সেলিম রেজা হাসান জানান, এ মডেল প্রয়োগে সহনশীল জীবিকা গড়ার পাশাপাশি সুন্দরবনের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে।
এইচএসবিসি ব্যাংক বাংলাদেশের হেড অব সাসটেইনেবিলিটি সৈয়দা আফজালুন নেসা জানান, অন্যান্য গাছের চেয়ে ম্যানগ্রোভ চার গুণ বেশি কার্বন শোষণ করায় প্রকৃতি সংরক্ষণ ও ম্যানগ্রোভ বনায়নে বৈশ্বিকভাবে অর্থায়ন বাড়ানো হচ্ছে।
গোলটেবিল বৈঠকে পাইকগাছার সফল চাষি লতিকা বালা বৈদ্য ও তুষার কান্তি মন্ডল নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। মৎস্য অধিদপ্তরের ব্লু ইকোনমি সেলের পরিচালক মো. সাজদার রহমান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাজমুল আহসান, আইইউসিএনের সারোয়ার আলম দীপু এবং নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের এ কে ওসমান হারুনীসহ সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন। প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।