রাজবাড়ী প্রতিনিধি: রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মদাপুর গ্রামে পাওনা ৬৮ হাজার টাকা আদায়ের জেরে আসাদুল ইসলাম নামের এক কলেজছাত্রকে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ পেট্রল দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। নিহত আসাদুল কালুখালী উপজেলার মদাপুর ইউনিয়নের বিলমানুষমারি গ্রামের কৃষক শাহজাহান মণ্ডলের ছেলে এবং বালিয়াকান্দি মীর মোশাররফ হোসেন ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন।
পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের অভাব ঘোচাতে তিনি একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মূল পরিকল্পনাকারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে কালুখালী থানা পুলিশ। মঙ্গলবার বিকেলে আসামিরা রাজবাড়ীর আদালতে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মদাপুর গ্রামের মো. মিজান শেখ, মিজানের খালু ও পশ্চিম রতনদিয়া গ্রামের আনোয়ার মণ্ডল এবং সূর্যদিয়া গ্রামের আবদুল করিম মোল্লা। মামলার বিবরণ ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগে আসাদুল তাঁর পূর্বপরিচিত মিজান শেখের কাছ থেকে ৬৮ হাজার টাকা ধার নেন।
নির্ধারিত সময়ে সেই টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য তৈরি হয়। একপর্যায়ে টাকা আদায়ের জন্য মিজান শেখ কয়েকজন পেশাদার সন্ত্রাসী ভাড়া করেন। গত রোববার বিকেলে আসাদুলকে কৌশলে একটি নির্জন এলাকায় ডেকে নিয়ে কিল-ঘুষি মেরে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করে ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা।
আসাদুল টাকা দিতে না পারায় রোববার রাত আটটার দিকে তাঁর সৌদিপ্রবাসী ভগ্নিপতির কাছে জরুরি প্রয়োজনে পাঁচ হাজার টাকা চান। এরপর থেকেই তাঁর ফোন বন্ধ হয়ে যায়। টাকা না পেয়ে সন্ত্রাসীরা আসাদুলের হাত-পা বেঁধে নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালায় এবং একপর্যায়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে শরীরের নির্যাতনের চিহ্ন ও আলামত মুছে ফেলতে ঘাতকরা তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের ট্যাংক থেকে পেট্রল বের করে আসাদুলের শরীরে ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।
গত সোমবার সকালে মদাপুর এলাকার একটি পাটখেতের পাশে বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচ থেকে আসাদুলের ঝলসে যাওয়া হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় আসাদুলের বাবা শাহজাহান মণ্ডল বাদী হয়ে কালুখালী থানায় অজ্ঞাতনামা সাত থেকে আটজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।
ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বিকেলে পুলিশ আসাদুলের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করলে সন্ধ্যার আগে নিজ গ্রামে জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়। আসাদুলের চাচা শফিকুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আসাদুলের মতো ভালো ছেলে এলাকায় খুব কমই আছে। তাকে ডেকে নিয়ে পুড়িয়ে মারা হলো, আমরা জড়িত প্রত্যেকের ফাঁসি চাই।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর রাজবাড়ী জেলা শাখার আমির মো. নূরুল ইসলাম দাবি করেছেন, আসাদুল জামায়াতের মদাপুর ইউনিয়নের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত সক্রিয় কর্মী ছিলেন। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার ও খুনিদের ফাঁসির দাবিতে সোমবার রাত ১১টা পর্যন্ত তিনিসহ দলীয় নেতা-কর্মীরা কালুখালী থানায় অবস্থান করেন।
রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোর্শেদ এবং সহকারী পুলিশ সুপার দেবব্রত সরকার জানান, ঘটনার রাতেই প্রধান তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, লোহার রড ও রক্তমাখা হেলমেট জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা সরাসরি মারধরের পরিকল্পনায় অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছে।
এই ঘটনায় মোট সাত থেকে আটজন জড়িত ছিল। পলাতক বাকি পেশাদার খুনিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।