গুজব প্রতিরোধ ও ডিজিটাল নিরাপত্তা: প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ও আইনি জবাবদিহিতার সমন্বয় জরুরি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেক আইডি ও গুজব রটনাকারীদের শাস্তির বিধান সাইবার সুরক্ষা আইনে যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
সম্পাদকীয় ডেস্ক: একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ‘গুম’ বা জোরপূর্বক নিখোঁজ করার মতো নিকৃষ্টতম অপরাধের চেয়ে বড় কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন হতে পারে না। বিগত দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনামলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে এক চরম আতঙ্কের জনপদে পরিণত করা হয়েছিল, যেখানে ভিন্নমত বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের মূল হাতিয়ারই ছিল ‘গুম’।
রাষ্ট্রযন্ত্রের লেলিয়ে দেওয়া বাহিনীগুলোর মাধ্যমে রাতের আঁধারে বা প্রকাশ্য দিবালোকে নিজ দেশের নাগরিকদের তুলে নিয়ে আয়নাঘরের মতো গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা অথবা চিরতরে নিখোঁজ করে দেওয়ার নিষ্ঠুর খেলায় মেতেছিল বিগত সরকার।
আজ শুক্রবার (২৬ জুন, ২০২৬) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে ‘ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অধিকার’ বিষয়ক এক জাতীয় সংলাপে যখন সেই অভিশপ্ত সময়ের শিকার হওয়া পরিবারগুলো একত্রিত হয়েছিল, তখন তাদের চোখের জল আর স্বজন হারানোর আকুল আর্তিতে পুরো মিলনায়তনে এক অবর্ণনীয় আবেগঘন ও ভারী পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
তবে এই দীর্ঘ কান্নার যবনিকাপাত ঘটিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত মানবিক, সংবেদনশীল ও ঐতিহাসিক ঘোষণা এসেছে।
সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন যে, গুমের শিকার ব্যক্তিদের অসহায় পরিবারগুলোর জন্য সরকারিভাবে ‘বিশেষ ভাতা’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং চলতি বাজেটেই এটি অন্তর্ভুক্ত করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হবে। বর্তমান সরকারের এই যুগান্তকারী ও সংবেদনশীল পদক্ষেপকে আমরা জানাই অন্তহীন সাধুবাদ।
বিগত সরকারের আমলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল নরকযন্ত্রণার চেয়েও ভয়াবহ। একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি যখন হঠাৎ হাওয়া হয়ে যান, তখন সেই পরিবারের ওপর যে কী নিষ্ঠুর বিপর্যয় নেমে আসে, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কারও পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
বছরের পর বছর ধরে সন্তানহারা মা, স্বামীহারা স্ত্রী আর পিতাহারা অবুঝ শিশুরা থানা, আদালত আর ডিবি কার্যালয়ের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে কেবল লাঞ্ছনা আর উপহাস কুড়িয়েছেন। বিগত সরকারের নিষ্ঠুরতা এতটাই চরমে ছিল যে, নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ‘মায়ের ডাক’-এর মতো প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে বিচার চাওয়ার অপরাধে এই পরিবারগুলোকে গোয়েন্দা নজরদারি, হয়রানি ও মিথ্যা মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং সামাজিকভাবে কোণঠাসা হয়ে এই পরিবারগুলো এক অন্ধকারের অতল গহ্বরে দিনাতিপাত করছিল। এই দুঃসহ পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ আর্থিক ভাতা ও পুনর্বাসনের এই উদ্যোগ কেবল তাদের বেঁচে থাকার রসদ জোগাবে না, বরং রাষ্ট্র যে তাদের পাশে আছে—এই পরম সান্ত্বনা ও এক টুকরো মানবিক অধিকার ফিরিয়ে দেবে।
সংলাপে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের বক্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে তিনি বলেছেন—এখন আর শুধু কান্নার সময় নয়, বরং অধিকার আদায় ও কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ডিক্রি জারি করার সময়।
তবে কেবল আর্থিক ভাতা বা সাময়িক পুনর্বাসনই গুমের মতো একটি আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধের স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। বাংলাদেশ থেকে গুমের সংস্কৃতি চিরতরে উৎপাটন এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা বাহিনী এই জঘন্য অপরাধ করার দুঃসাহস না দেখায়, তার জন্য অবিলম্বে কিছু কাঠামোগত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বিগত শাসনামলে কার নির্দেশে, কোন কোন গোয়েন্দা বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গুমের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করতে একটি শক্তিশালী স্বাধীন কমিশন গঠন করতে হবে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের আশাবাদ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে অনতিবিলম্বে গুম-সংক্রান্ত একটি স্থায়ী বা বিশেষ ‘সংসদীয় কমিটি’ গঠন করা উচিত। এই কমিটি নিয়মিত ভুক্তভোগীদের ফাইল ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাজের জবাবদিহিতা তদারকি করবে।
জাতিসংঘ প্রণীত ‘জোরপূর্বক গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশন’-এ বাংলাদেশের পূর্ণ অনুস্বাক্ষর ও এর আলোকে দেশীয় দণ্ডবিধিতে গুমকে একটি স্বতন্ত্র ও জামিনঅযোগ্য চরম অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে কঠোর সাজার আইন পাস করতে হবে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে বর্তমান নখদন্তহীন অবস্থা থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও সরাসরি তদন্ত করার আইনি এখতিয়ার প্রদান করতে হবে, যাতে যেকোনো বাহিনীর গোপন বন্দিশালায় তারা ঝটিকা তল্লাশি চালাতে পারে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা থেকে মুক্ত করতে বিনামূল্যে মানসিক থেরাপি ও রাষ্ট্রীয় খরচে উচ্চ আদালতে আইনি লড়াই করার জন্য ডেডিকেটেড লিগ্যাল এইড সেল গঠন করা দরকার।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ঘোষণা অনুযায়ী, চলতি বাজেটে এই বিশেষ ভাতার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন দেখতে দেশের আপামর জনতা উন্মুখ হয়ে আছে। গুমের শিকার পরিবারগুলোর দীর্ঘকালের পুঞ্জীভূত দীর্ঘশ্বাস ও ক্রন্দনকে মুছে দিয়ে একটি মানবিক, আইনানুগ ও জবাবদিহিতামূলক নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই যাত্রায় বর্তমান সরকার সফল হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।