আন্তর্জাতিক ডেস্ক: প্রায় দুই হাজার বছর আগে মাউন্ট ভেসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছিল একটি প্রাচীন প্যাপিরাস স্ক্রল (গুটিয়ে রাখা কাগজের পাণ্ডুলিপি)। হাত দিয়ে স্পর্শ করলেই যা গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার কথা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির সহায়তায় অবিকল সেই স্ক্রলটিই ডিজিটাল পদ্ধতিতে খুলে ভেতরের লেখার একাংশ উদ্ধার করেছেন গবেষকরা।
ইতিহাসে ‘পিহার্স ১৬৬৭’ (PHerc. 1667) নামে পরিচিত এই স্ক্রলটি প্রাচীন রোমান শহর হারকুলেনিয়ামের একটি বহুতল ভবন থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। ৭৯ খ্রিস্টাব্দে ভেসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে পুরো শহরটি লাভা ও ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে। আঠারো শতকে এক ইতালীয় কৃষক মাটির নিচে এই প্রাচীন গ্রন্থাগারটির সন্ধান পান, যা প্রাচীন সভ্যতার টিকে থাকা একমাত্র বড় আকারের লাইব্রেরি।
যেভাবে কাজ করেছে প্রযুক্তি
অগ্নিদগ্ধ হওয়ার কারণে এই পাণ্ডুলিপিগুলো অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিল। অতীতে রাসায়নিক, গ্যাস বা চাপ প্রয়োগ করে এগুলো খোলার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবারই প্রাচীন এই সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
এই জটিল সমস্যার সমাধানে ২০২৩ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী একটি গবেষণা প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল স্ক্রলগুলো স্পর্শ না করে ডিজিটাল উপায়ে পড়া।
গবেষকরা প্রথমে এক্স-রে ও সিটি স্ক্যানের (CT Scan) মাধ্যমে গুটিয়ে থাকা প্যাপিরাসটির ভেতরের প্রতিটি স্তরের একটি ত্রিমাত্রিক (3D) নকশা তৈরি করেন। এরপর কম্পিউটার সফটওয়্যারের সাহায্যে কাগজের সেই বাঁকানো স্তরগুলোকে ডিজিটালভাবে সোজা বা সমতল করা হয়। সবশেষে, কাগজের ওপর থাকা প্রাচীন কালির দাগ শনাক্ত করতে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত এআই মডেল ব্যবহার করা হয়।
ইতালির নেপলসে অনুষ্ঠিত এক কনফারেন্সে গবেষকরা একে একটি “ঐতিহাসিক যুগান্তকারী আবিষ্কার” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা একটি সম্পূর্ণ স্ক্রল ডিজিটালভাবে উন্মোচন করতে পেরেছেন, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১.৫ মিটার (৪.৯ ফুট) এবং এতে ২০টি কলামজুড়ে প্রাচীন টেক্সট রয়েছে।
কী লেখা আছে সেই প্রাচীন কাগজে?
প্যাপিরাস বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া এই লেখাগুলো মূলত প্রাচীন গ্রীক দর্শনের ‘স্টোইক’ (Stoic) মতবাদের ওপর ভিত্তি করে রচিত। এতে মানুষের নৈতিকতা, শিল্পকলা এবং আচরণ নিয়ে দার্শনিক আলোচনা রয়েছে।
সেখানে মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের অনুবাদ করা একটি লাইনে লেখা রয়েছে: “আমরা কোনো কিছু অনুসন্ধান করব ঠিকই, কিন্তু তা উপলব্ধি করতে পারব না, যদি কোনোভাবে আমরা নিজেদের থেকে এবং আমাদের নিজস্ব প্রকৃতি থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ি।”
এ ছাড়া ‘পিহার্স ১৩৯’ (PHerc. 139) নামের আরেকটি পোড়া স্ক্রল থেকে গবেষকরা বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক ফিলোডেমাসের লেখা ‘অন গডস’ (ঈশ্বরের প্রতি) বইটির অষ্টম খণ্ডের সন্ধান পেয়েছেন। এর আগে ধারণা করা হতো এই বইটির মাত্র একটি খণ্ডই অস্তিত্বে ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি আবিষ্কারের ফলে এখন প্রাচীন ইতিহাসের হাজার হাজার না বলা কথা এবং দর্শন মানুষের সামনে উন্মোচিত হওয়ার এক নতুন দিগন্ত খুলে গেল।