একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন একটি সুস্থ, দক্ষ, মেধাবী ও মানবিক জনগোষ্ঠী। আর সেই মানবিক জনগোষ্ঠী গড়ার অবিকল্প ভিত্তি হলো মানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষা, উচ্চতর চিকিৎসা গবেষণা এবং আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা।
বাংলাদেশের চিকিৎসা বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে যে প্রতিষ্ঠানটি এই মহতী ভিত্তির অবিসংবাদিত বাতিঘর হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, তা হলো আমাদের সবার গর্বের ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ’ (ঢামেক)। ১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত সুদীর্ঘ আটটি দশক ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রধানতম স্তম্ভ হিসেবে অনন্য অবদান রেখে চলেছে।
গৌরবময় এই পথচলার ৮০ বছর পূর্তি ও ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার (৭ জুলাই, ২০২৬) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ঢামেক পরিবারের বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক।
প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার একটি দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় তাগিদও বটে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইতিহাস আর বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস যেন একই সুতোয় গাঁথা। এই প্রতিষ্ঠানের আঙিনা শুধু রোগাক্রান্ত মানুষের সেবাই দেয়নি, বরং দেশের প্রতিটি প্রগতিশীল ও জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের চেতনাকে ধারণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর পোস্টে অত্যন্ত যথার্থভাবেই স্মরণ করেছেন ৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন, ৭১-এর গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সর্বশেষ ২৪-এর ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত গণ-অভ্যুত্থানের কথা। ইতিহাস সাক্ষী, প্রতিটি জাতীয় ক্রান্তিলগ্নে, ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিংবা কোভিডের মতো বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঢামেকের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকেরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে প্রথম সারির যোদ্ধা হিসেবে লড়েছেন।
বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া থেকে শুরু করে রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া—ঢামেক পরিবারের এই ঐতিহাসিক অবদানকে বাঙালি জাতি চিরকাল গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
দীর্ঘ এই আট দশকের পথচলায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ অসংখ্য বিশ্বমানের দক্ষ, মানবিক ও দেশপ্রেমিক চিকিৎসক ও গবেষক তৈরি করেছে, যাঁরা আজ শুধু দেশের প্রান্তিক জনপদেই নন, বরং বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্রেও অত্যন্ত সুনামের সাথে পেশাগত উৎকর্ষ ও নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখছেন।
তবে বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা , ন্যানো-টেকনোলজি, রোবোটিক সার্জারি এবং উন্নত জিনোমিক্স গবেষণা আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতকে এক নতুন সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের হাওয়া থেকে বাংলাদেশও পিছিয়ে থাকতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে যে আহ্বানটি জানিয়েছেন তা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী—ঢাকা মেডিকেল কলেজকে তার অতীত গৌরব ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে আগামী দিনেও এই আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণাভিত্তিক জ্ঞানচর্চায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে আমাদের দেশের মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আর বিদেশমুখী হতে না হয়।
পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢামেক পরিবারের দেশে-বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের (অ্যাল্যামনাই) প্রতি যে বিশেষ বার্তা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নিজ প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়ন, বর্তমান সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি ও ক্রান্তিলগ্নে সাধারণ রোগীদের কল্যাণে সামর্থ্যবান চিকিৎসকদের এগিয়ে আসা উচিত।
এটি করা হলে মাতৃভূমি এবং যে বিদ্যাপীঠের হাত ধরে তাঁরা আজ সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত, তার প্রতি ঋণের কিছুটা হলেও শোধ হবে। ৮০ বছরের গৌরবময় অভিজ্ঞতা এবং ৮১তম প্রতিষ্ঠাদিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের প্রত্যাশা—ঢাকা মেডিকেল কলেজ আমলাতান্ত্রিক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে জ্ঞান, মানবিকতা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্বমঞ্চে উৎকর্ষের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং স্বনির্ভর নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।