খেলাপি ঋণের পাহাড় ও ব্যাংকিং খাতের সংকট: কাগজের শিথিলতা নয়, চাই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি
বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ও সংকটাপন্ন ঋণের সর্বশেষ চিত্র, কাঠামোগত ত্রুটি এবং ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনে চার দফা জরুরি সুপারিশ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শাসনতান্ত্রিক এবং সাংবিধানিক পদ হলো রাষ্ট্রপতির পদ। সংবিধান অনুযায়ী তিনি কেবল রাষ্ট্রের প্রধান নন, বরং সমগ্র জাতির ঐক্য, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রতীক। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা—কে হবেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি এবং রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের মাপকাঠি কী হওয়া উচিত?
সময় এসেছে প্রথাগত দলীয় আনুগত্যের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পেছনে ফেলে উপযুক্ত যোগ্যতা, বিচক্ষণতা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন করার।
রাষ্ট্রপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক ও আধুনিক দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
রাষ্ট্রপতি হলেন সংবিধানের প্রধান রক্ষক। রাষ্ট্রের চরম সংকটে বা রাজনৈতিক জটিলতায় সংবিধানের চেতনা অক্ষুণ্ণ রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুগভীর জ্ঞান তাঁর থাকতে হবে। আইন ও সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর স্পষ্ট দখল থাকলে তিনি যেকোনো পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলাপ-আলোচনা, আন্তর্জাতিক সংস্থায় দেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা এবং বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারে এমন এক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব দরকার, যার আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতিকে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের ঊর্ধ্বে উঠে সমগ্র জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে হয়। তাই তাঁর ব্যক্তিত্ব হওয়া উচিত সর্বজনগ্রাহ্য, গ্রহণযোগ্য এবং নিরপেক্ষ। দেশের জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে তাঁর নীতিগত অবস্থান ও দূরদর্শিতা জরুরি।
বর্তমান অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্বায়নের যুগে একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে অর্থনৈতিক কূটনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার এবং বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মতো বিষয়গুলোতে পরিষ্কার ধারণা রাখতে হয়। নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক দরবারে দেশের সম্মান কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
একটি দেশের শাসনব্যবস্থা, গণতন্ত্রের পরিপক্বতা এবং সার্বিক ভাবমূর্তি বহুলাংশে নির্ভর করে সেই দেশের প্রধান প্রতিনিধি অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিত্বের ওপর। বিশ্বের কূটনৈতিক মঞ্চে একজন দক্ষ, সুশিক্ষিত ও বাকপটু রাষ্ট্রপতি দেশকে যেভাবে উপস্থাপন করতে পারেন, তা দেশের জন্য সম্মান ও কৌশলগত সুবিধা বয়ে আনে।
দক্ষ রাষ্ট্রপ্রধান কেবল আনুষ্ঠানিক সফরই করেন না, বরং তাঁর সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বহির্বিশ্বের বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা অর্জন করতে পারেন।
বৈশ্বিক মঞ্চে বা আঞ্চলিক সংকটে (যেমন: রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ফান্ডের অধিকার ইত্যাদি) দেশের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে একজন আন্তর্জাতিক মানের রাষ্ট্রপতির প্রভাব অপরিসীম।
একজন সংস্কৃতিমনা, জ্ঞানী ও দূরদর্শী রাষ্ট্রপতি যখন বিশ্বমঞ্চে বক্তব্য রাখেন, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পুরো দেশ সম্পর্কে একটি উচ্চ ধারণা পোষণ করে।
সংক্ষেপে, রাষ্ট্রপতির আসনটি কোনো পুরস্কার বা কেবলই আনুষ্ঠানিক পদ নয়; এটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। দেশের মর্যাদা রক্ষা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া এবং বৈশ্বিক দরবারে বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে হলে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বোচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন ও দক্ষ ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রপতির পদে আসীন করাই হবে সময়ের সঠিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।