বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক দশকের সংকটময় মানবিক পরিস্থিতি পুনরায় আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের নেতৃত্বাধীন ১১ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)-এর কার্যক্রম তদারকি, রোহিঙ্গাদের সরাসরি জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ এবং বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক—সব মিলিয়ে এই সফর বৈশ্বিক কূটনৈতিক অঙ্গনে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়। একই সাথে, সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বৈঠকের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের সমর্থন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তবে, কেবল মানবিক সহায়তা কিংবা সাময়িক ত্রাণের মধ্যে এই দীর্ঘমেয়াদী সংকটকে সীমাবদ্ধ রাখা আর সম্ভব নয়; আন্তর্জাতিক এই মনোযোগকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
দীর্ঘদিন ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চরম চাপের মুখোমুখি। কক্সবাজারের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক অনুদান ক্রমেই হ্রাস পাওয়ার ফলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি:
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের উচিত মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও অভ্যন্তরীণ কর্তৃপক্ষের ওপর অবরোধ ও রাজনৈতিক কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক মানবাধিকারের স্বীকৃতি না দেওয়া পর্যন্ত টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। বিশেষ দূত সার্জিও গোরের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মিয়ানমারের নিরাপত্তা সুসংহত করতে কার্যকর কৌশল প্রয়োগের তাগিদ দিতে হবে।
রোহিঙ্গারা যাতে নিজেদের ভিটেমাটিতে স্বাধীনভাবে, নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে ফিরে যেতে পারে—তা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ দলকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্ব প্রদান জরুরি।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পুরোপুরি শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত রোহিঙ্গা শিবিরের মানবিক সহায়তা যেন কমে না যায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে ডব্লিউএফপি ও জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থার আর্থিক বরাদ্দ অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ স্থানীয় ভূমিকা অনস্বীকার্য।
কেবল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বি-পাক্ষিক সংলাপে বহু বছর ধরে কাক্সিক্ষত ফলাফল আসেনি। বাংলাদেশ সরকারের উচিত যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, চীন, ভারত ও আসিয়ান (ASEAN) জোটকে সাথে নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক প্রত্যাবাসন ফ্রেমওয়ার্ক গঠন করা।
পরিশেষে বলা যায়, বিশেষ দূত সার্জিও গোরের কক্সবাজার ক্যাম্প পরিদর্শন এবং প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের এই সুযোগটি বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারে। বাংলাদেশ কোনো অবস্থাতেই অনির্দিষ্টকালের জন্য রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভার বহন করতে পারবে না। ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি এবং তা দ্রুত বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল, বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।