সম্পাদকীয়

আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও জুলাই গণহত্যার বিচারে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ‘বর্ষাবিপ্লবে’ পতন ঘটেছিল দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের। সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ছাত্র-জনতার ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের মাধ্যমে যে বর্বরোচিত হামলা, নির্বিচার গুলিবর্ষণ ও গণহত্যা চালানো হয়েছিল—তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় প্রায় দেড় সহস্রাধিক প্রাণহানি এবং হাজার হাজার তরুণ-যুবকের পঙ্গুত্ব বরণ করার ঘটনা কেবল মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনই নয়, বরং তা আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। সাম্প্রতিক সময়ে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বা ফেরত আনার বিষয়ে যে আলোচনা রাজপথে ও কূটনৈতিক অঙ্গনে উঠে এসেছে, তার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন।

দেশে ফিরলে বা ফিরিয়ে আনা হলে জুলাই গণহত্যার প্রধান রূপকার ও নির্দেশদাতা হিসেবে শেখ হাসিনাকে কোনো ধরনের আপস ছাড়াই বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি করা এখন জাতীয় ও নৈতিক দাবি।

জুলাই আন্দোলনের সময় হেলিকপ্টার থেকে গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, মারণাস্ত্রের ব্যবহার এবং রংপুরের আবু সাঈদ, ঢাকার মুগ্ধসহ অসংখ্য তাজা প্রাণের রক্তে রাজপথ ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনা কোনো আকস্মিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না। তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি সবুজ সংকেত ও কঠোর আদেশেই এই ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালিত হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার প্রাথমিক অনুসন্ধানেও শেখ হাসিনা সরকারের এই বলপ্রয়োগকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার পর্যপ্ত উপাদান পাওয়া গেছে। যেকোনো গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি পদমর্যাদা নির্বিশেষে আইনের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।

শেখ হাসিনার বিচারে কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের সুযোগ রাখা যাবে না। বিচার প্রক্রিয়া হতে হবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, স্বচ্ছ এবং বিতর্কাতীত। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে ট্রাইব্যুনালে দক্ষ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিচারক ও প্রসিকিউশন টিম নিশ্চিত করতে হবে। জুলাই গণহত্যার সময় সিসিটিভি ফুটেজ, অডিও ক্লিপ, সরকারি নির্দেশের নথি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য যথাযথভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় সাজানো জরুরি। প্রয়োজনে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় বা আন্তর্জাতিক বিচারিক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ যুক্ত করে এই বিচারকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে।

পলাতক শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক মুখোমুখি করতে হলে ভারতকে সাথে নিয়ে দ্বিপক্ষীয় ‘বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি’ -এর আইনি ধারা প্রয়োগ করা প্রয়োজন। স্বৈরাচারী অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্যই আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত। বাংলাদেশ সরকারের উচিত অত্যন্ত জোরালো ও পেশাদার কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করার আন্তর্জাতিক ও আইনি তাগিদ অব্যাহত রাখা।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য জুলাই গণহত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার অপরিহার্য। শহীদের রক্ত ও পঙ্গুত্ব বরণকারী হাজারো যোদ্ধাদের প্রতি রাষ্ট্রের মূল দায়বদ্ধতাই হলো অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান।

স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা বা তাঁর সহযোগী কাউকেই বিচারের আওতার বাইরে রাখা হলে ন্যায়বিচারের মূল চেতনা ক্ষুণ্ন হবে। সত্য, ন্যায় ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই জুলাই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে হবে—এটাই সমগ্র দেশবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাস্ট্রচিন্তক।

Related News

‘জুলাই ৩৬ জাদুঘর’—ক্ষমতার দম্ভ বনাম ছাত্র-জনতার ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মারক : এম. নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক উদ্বোধনকৃত ‘জুলাই ৩৬ গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ (সাবেক গণভবন), ফ্যাসিবাদের ইতিহাস, আয়নাঘর ও ছাত্র-জনতার আন্দোলন নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

দল-মত ভুলে দেশের স্বার্থে জাতির স্বার্থে জুলাইকে ধারণ করে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হবে : এম. নাজমুল হাসান

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস, শেখ হাসিনার পতন এবং বর্তমান বাংলাদেশ পুনর্গঠনে দল-মত ভুলে এক হয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

শিক্ষাঙ্গনে সংঘাত বনাম ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্য: কলুষতা রোধে চাই জরুরি পদক্ষেপ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সহিংস সংঘর্ষ, শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা এবং ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্য রক্ষায় করণীয় নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

নতুন এটিসি টাওয়ার ও আধুনিক রাডার: আকাশসীমার নিরাপত্তা ও জাতীয় রাজস্বে এক নবদিগন্ত

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন এটিসি টাওয়ার ও অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেম চালুর সুফল, আকাশসীমার নিরাপত্তা এবং ফ্লাইং ওভার চার্জে রেকর্ড রাজস্ব আদায় নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা ও মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি : একটি কৌশলগত সমাধান

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির সরকারের প্রস্তাব, এর বাস্তবায়ন কৌশল এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী গ্যাস সংকট নিরসনে করণীয় নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

সরকার-ব্যবসায়ী যৌথ অংশীদারিত্ব: পাঁচ বছরে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ

বিডার মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য, আগামী ৫ বছরে অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিতকরণ এবং ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

রোহিঙ্গা সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উপস্থিতি: প্রত্যাবাসনের টেকসই রোডম্যাপ প্রণয়নের এটাই উপযুক্ত সময়

মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে সম্পাদকীয় প্রতিবেদন।

মাঠপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শন: জনবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

ডিএনসিসি প্রশাসককে সঙ্গে নিয়ে গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রীর নিজে গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সড়ক পরিদর্শনের প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search