দেশের নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্প্রতি ঘোষিত ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিপূর্বক সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন দেশের মোট জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
বিশেষ করে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, ডলার সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক সরবরাহ লাইনে আকস্মিক বাধা সৃষ্টির মতো সংকটকালীন মুহূর্তে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের পুঁজি ও পরিকাঠামো ব্যবহার করার নীতি যৌক্তিক। তবে এই স্পর্শকাতর খাতে যেকোনো নতুন নীতিমালার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত জনস্বার্থ, প্রতিযোগিতা এবং পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা।
সম্প্রতি এই প্রস্তাবিত নীতিমালাকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, জ্বালানি বিভাগ সুস্পষ্ট সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা দিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রস্তাবিত নীতিমালায় কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা বা একচেটিয়া প্রাধান্য দেওয়ার সুযোগ নেই এবং ছড়ানো তথ্যের অনেকটাই অনুমাননির্ভর ও অসত্য। সরকারি সংস্থার এই স্পষ্টীকরণ যেমন তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করতে সাহায্য করে, তেমনি নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় চরম সততা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখার তাগিদকেও পুনরুজ্জীবিত করে।
জ্বালানি খাতের মতো স্পর্শকাতর ও কৌশলগত ব্যবসায় বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া অপরিহার্য।
১. লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও একচেটিয়া আধিপত্য রোধ
বেসরকারি খাতকে স্বাগত জানানোর অর্থ এই নয় যে বাজারের নিয়ন্ত্রণ কয়েকটি বৃহৎ সিন্ডিকেট বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাবে। লাইসেন্স প্রদান, আমদানি কোটা বণ্টন এবং মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শতভাগ উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি সৎ উদ্যোক্তারাও এতে অংশ নিতে পারেন।
২. অংশীজনদের কার্যকর মতামত ও স্বচ্ছতা
জ্বালানি বিভাগ থেকে যেমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, নীতিমালা চূড়ান্ত করার পূর্বে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ এবং ভোক্তা অধিকার সংস্থাগুলোর সাথে উন্মুক্ত আলোচনা ও মতামত গ্রহণ করতে হবে। সর্বসাধারণের সুবিধার কথা মাথায় রেখে খসড়া নীতিমালা প্রকাশ ও পর্যালোচনা করা হলে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকবে না।
৩. কোয়ালিটি কন্ট্রোল ও জাতীয় নিরাপত্তা বিধান
জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে জ্বালানির মান (Quality Control) এবং পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বেসরকারি প্রক্রিয়ায় আমদানিকৃত তেলের মান নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে কোনো অসাধু চক্র নিম্নমানের জ্বালানি বাজারজাত করতে না পারে।
জ্বালানি খাত একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তাই একে কেন্দ্র করে যেকোনো গুজব বা অসত্য তথ্য যেমন বাজারের জন্য ক্ষতিকর, তেমনই নীতি প্রণয়নে যেকোনো ধরনের শিথিলতা বা আমলাতান্ত্রিক অস্পষ্টতাও কাম্য নয়। দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন এবং রাষ্ট্রীয় তদারকির সমন্বয়ে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ‘জ্বালানি নীতিমালা ২০২৬’ চূড়ান্ত করা হবে—এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাস্ট্রচিন্তক।