বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ও কৌশলগত কারণে অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। তবে একটি টেকসই ও অর্থবহ বন্ধুত্বের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং আন্তর্জাতিক আইনের যথাযথ অনুসরণ। সম্প্রতি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং তাতে উত্থাপিত বিষয়াবলী দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শহীদ ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামিদের দ্রুত্য ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত হয়েছে, যা পুরোপুরি আইনি ও ন্যায়বিচারের দাবি।
আন্তর্জাতিক বিচারিক মানদণ্ড মেনে পরিচালিত বিচারে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার বিপ্লব দমনে প্রাণঘাতী আদেশের প্রমাণ মিলেছে। অপরাধে অভিযুক্ত কিংবা সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি যখন প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নেন, তখন তা কেবল বিচারিক প্রক্রিয়াকেই বাধাগ্রস্ত করে না, বরং দুই দেশের সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের যে বিদ্যমান ‘বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি’ রয়েছে, তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এখন সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপটে কতগুলো মৌলিক বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জুলাই গণহত্যার শিকার হাজারো শহীদ ও আহত পরিবারের কাছে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের পরম অঙ্গীকার। কোনো ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে তাঁকে রাজনৈতিক আইনি সুবিধা প্রদান করা দুই দেশের বন্ধুত্বের চেতনার পরিপন্থী। আসামি প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে ভারত ন্যায়বিচারের পক্ষে তার শক্ত অবস্থানের প্রমাণ দিতে পারে।
শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে যুক্ত আসামিদের ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গে চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একজন উদীয়মান তরুণ নেতাকে নির্মমভাবে হত্যার আসামিদের আশ্রয় বা ফেরত পাঠাতে বিলম্ব হলে তা দুই দেশের অপরাধ দমন ও যৌথ সীমান্ত সুরক্ষার প্রতিশ্রুতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাদের দ্রুত হস্তান্তর করা উচিত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যথার্থই উল্লেখ করেছেন যে, বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে উপযুক্ত ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। বিগত আমলের ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলকেন্দ্রিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ধারা থেকে বের হয়ে এসে দুই দেশের জনগণের মধ্যকার স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সময় এসেছে।
শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিতকরণ ও খুনিদের হস্তান্তরের অনুরোধ কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং এটি আইনের শাসন ও সার্বভৌম মর্যাদার প্রশ্ন। ভারত সরকার যদি এই স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে ইতিবাচক ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে তা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বিদ্যমান মেঘ কাটিয়ে নতুন এক পারস্পরিক ট্রাস্ট ও সহযোগিতার যুগ সূচনা করবে—এটাই সকল সচেতন নাগরিকের প্রত্যাশা।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাস্ট্রচিন্তক।