দীর্ঘ প্রায় এক যুগ পর সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন স্কেল চালুর প্রক্রিয়া বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার পর থেকে আজ অবধি বাজার দর, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুক এবং অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, সচিব কমিটি প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সই করেছে।
দুই ধাপে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই নতুন বেতনকাঠামো মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বড় ধরণের স্বস্তি বয়ে আনবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
তবে একটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন যেমন সময়োপযোগী ও যৌক্তিক, তেমনি এটি জাতীয় বাজেটের ওপর এক বিশাল আর্থিক চাপের সৃষ্টি করবে।
বিগত ১১ বছরে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, ঘরভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা খরচ যে হারে বেড়েছে, তাতে পূর্বের নির্ধারিত ৮,২৫০ টাকা সর্বনিম্ন মূল বেতন দিয়ে একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে জীবনধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
দীর্ঘমেয়াদে বেতন অপরিবর্তিত থাকলে সরকারি কর্মচারীদের বাস্তব আয় (Real Income) কমে যায়, যা তাদের জীবনযাত্রার মানকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১,৬০,০০০ টাকা করার প্রস্তাবনা কর্মচারীদের সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা দেবে।
উপযুক্ত ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সংগতিপূর্ণ বেতনকাঠামো সরকারি প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সততা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক বেতন স্কেল মেধাবীদের সরকারি সেবায় আকৃষ্ট করতে সাহায্য করবে।
যদিও এই বেতন বাড়ানো মানবিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে সম্পূর্ণ যৌক্তিক, তথাপি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কেবল বেতন-ভাতার জন্য ৮৯,৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ৪১,৪৩৪ কোটি টাকার বিশাল বরাদ্দ রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বড় ধরণের টান ফেলবে।
বাজারে একযোগে বিপুল পরিমাণ অর্থের সরবরাহ (Money Supply) ঘটলে বেসরকারি খাতে নিত্যপণ্যের দাম আরও এক দফা বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে, যার চরম প্রভাব পড়বে দেশের বৃহৎ বেসরকারি খাত ও নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষের ওপর।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) কর আদায়ের হার যদি আশানুরূপ বৃদ্ধি না পায়, তবে নতুন পে স্কেলের ব্যয় মেটাতে সরকারকে ব্যাংক ঋণ বা ঘাটতি বাজেটের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
দুই ধাপে (প্রথম বছরে মূল বেতন এবং দ্বিতীয় বছরে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা) নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর করার সরকারের সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে কৌশলগত। এটি এককালীন বড় ধাক্কা থেকে বাজেটকে রক্ষা করবে। তবে নতুন পে স্কেল কার্যকর করার পাশাপাশি সরকারকে অবশ্যই বাজার দর নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ঘটাতে না পারে।
একই সাথে কর জাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করতে হবে, যেন এই বিপুল ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপর অতিরিক্ত করের হিসেবে চেপে না বসে। সুশাসন, দক্ষ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থার সমন্বয়েই এই নতুন বেতন স্কেল দেশের অর্থনীতিতে টেকসই ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাস্ট্রচিন্তক।