সম্পাদকীয়

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকিং খাতে আমূল সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের তাগিদ

দেশের অর্থব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলো ব্যাংকিং খাত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অব্যवस्था, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নামে-বেনামে বেনামী ঋণ বিতরণ এবং দুর্বল তদারকির কারণে এই খাতটি যে ভঙ্গুর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, তা নতুন করে সামনে এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক খেলাপি ঋণের তথ্যে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই (জানুয়ারি-জুন) দেশের শীর্ষ পাঁচ রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক—সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৬ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা।

এর ফলে জুন শেষে এই পাঁচ ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পাহাড়সম পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকায়। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের এই আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও আমানতকারীদের আস্থার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ব্যাংকিং সংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বিগত সরকারের সময় প্রভাবশালীদের প্রদত্ত বড় অঙ্কের ঋণ নতুন করে খেলাপি হওয়া এবং পুরোনো ঋণ আদায়ে চরম স্থবিরতাই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। রাজনৈতিক বিবেচনায় কিংবা অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণ পরিশোধে খেলাপিদের অনিচ্ছা পুরো আর্থিক খাতকে গভীর সংকটে ঠেলে দিচ্ছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে কতগুলো সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত দুর্বলতা কাজ করছে।  নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও অযোগ্য গ্রাহকদের যেসব কোটি কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর কিস্তি বন্ধ থাকায় এখন তা নতুন করে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

ইতিপূর্বে বারবার অকার্যকর নীতি-সুবিধা দিয়ে যেসব ঋণ কাগজ-কলমে ‘নিয়মিত’ রাখা হয়েছিল, সুযোগ শেষ হতেই সেগুলো আবার বিপুল অঙ্কে খেলাপি ঋণের খাতায় ফেরত আসছে।

অর্থঋণ আদালতে ঝুলে থাকা হাজার হাজার মামলা এবং প্রভাবশালী খেলাপিদের কাছ থেকে শক্ত হাতে জামানতের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে কাঠামোগত দুর্বলতা ও অনিচ্ছা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যাংকিং খাতের এই নৈরাজ্য চিরতরে বন্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ করছেন না, সেই ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের’ পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা, সম্পদ ফ্রিজ করা এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক সুবিধা বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

মন্দ ও খেলাপি ঋণ আলাদা করে তা আদায়ে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বা কঠোর আইনি ফ্রেমওয়ার্ক চালু করতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ থেকে রাজনৈতিক নিয়োগ বন্ধ করে পেশাদার ও অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের হাতে দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে, যাতে ঋণ মঞ্জুরিতে শতভাগ স্বচ্ছতা থাকে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বা খেলাপি ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের করের টাকায় পুনঃমূলধন দিয়ে মেটাতে হয়, যা চরম অন্যায়। এই খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ না হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সময় এসেছে খেলাপি ঋণের আইনি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে বকেয়া টাকা আদায় করা এবং ব্যাংক খাতের অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাস্ট্রচিন্তক।

Related News

বিমানবন্দরে লাগেজ চুরি: প্রবাসী হয়রানি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ চাই*- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসী হয়রানি, লাগেজ চুরি ও ট্রলি সংকট বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

দৈনিক শব্দমিছিলের সিনিয়র রিপোর্টার মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন ৪৭ সদস্যের কাফেলাসহ ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে

পবিত্র ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন দৈনিক শব্দমিছিলের সিনিয়র রিপোর্টার মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন। ৪৭ সদস্যের কাফেলা আগামী ১৭ অক্টোবর দেশে ফিরবে।

কারাগারে নির্যাতনের গুজব ও বাস্তবতা: স্পিকারের বক্তব্যই সত্য- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

কারাবন্দি সাবেক এমপিদের নির্যাতনের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে স্পিকারের বক্তব্যকে সত্য হিসেবে তুলে ধরলেন রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

গ্রেফতার, প্রতিবাদ ও আগামীর বাংলাদেশ- রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

মেজর আখতারুজ্জামানের গ্রেফতার, জামায়াতের মিছিল ও বিমানমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে জাতীয় রাজনীতির বিশ্লেষণ তুলে ধরলেন রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান।

সংলাপ ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা – রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রীর আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশ্লেষণধর্মী কলাম।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ফেনী সফর; উন্নয়ন, আবেগ ও সুশাসনের চিত্র : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সফর, কৃষক কার্ড বিতরণ, মহুরী সেচ প্রকল্প ও ১০০ শয্যার হাসপাতাল ঘোষণা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

জননিরাপত্তা, রাজনৈতিক শৃঙ্খলার পরীক্ষা ও সরকারের দায়বদ্ধতা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, সরকারের বিব্রতবোধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ বেঁধে দেওয়া ঠিক হবে না : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন, এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার বিধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্থায়ী রূপরেখা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search