বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনৈতিক বিকাশ ও সাংগঠনিক বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তৃণমূলের আন্দোলন এবং রাজপথের কঠিন পরীক্ষা অতিক্রম করে দলীয় মূল নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে উন্নীত নেতাদের মধ্যে অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। মাঠপর্যায়ের ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, দীর্ঘ রাজনৈতিক কারাবরণ এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক পথপরিক্রমা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গতিশীল অধ্যায় নির্দেশ করে।
রুহুল কবির রিজভীর পারিবারিক শিকড় কুড়িগ্রাম জেলায় হলেও তাঁর জন্ম ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। তাঁর প্রারম্ভিক শিক্ষাজীবন দেশের একাধিক অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল; তিনি বগুড়া জিলা স্কুল, কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এবং বগুড়া বাংলা স্কুলে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর সম্পন্ন করে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগ এবং ইতিহাস—এই উভয় বিষয়ে স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক (এলএলবি) ডিগ্রি সম্পন্ন করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে পেশাগত যোগ্যতা অর্জন করেন।
রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পাঠ তিনি গ্রহণ করেন উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে অধ্যয়নের সময় বামপন্থি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে। তিনি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের রাজশাহী সরকারি কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারী হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল গঠিত হলে তিনি উক্ত সংগঠনে যোগ দেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়ে পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন।
১৯৮০-এর দশকে তৎকালীন সামরিক শাসনবিরোধী জাতীয় আন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছিল রাজনৈতিক বিক্ষোভের প্রধানতম দুর্গ। সেই সময় উত্তাল রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী মিছিলে অগ্রণী ভূমিকা পালনের মাধ্যমে রুহুল কবির রিজভী আঞ্চলিক পরিধি পেরিয়ে জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নজর কাড়েন।
সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ১৯৮৪ সালের ২২ ডিসেম্বর এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি প্রতিপক্ষের গুলিতে মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হন। উক্ত ঘটনার ভয়াবহতা এতই তীব্র ছিল যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ভয়েস অব আমেরিকা’সহ বিভিন্ন মাধ্যমে সে সময় ভুলবশত তাঁর মৃত্যুর সংবাদ পর্যন্ত প্রচারিত হয়েছিল।
অলৌকিকভাবে মারাত্মক আহত অবস্থায় মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এলেও সেই গুলির ক্ষত দীর্ঘমেয়াদে তাঁর শারীরিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলে। তবে এই প্রাণঘাতী আঘাত তাঁর রাজনৈতিক সংকল্পকে দমিত করার পরিবর্তে কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা ও ভাবমূর্তিকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করে।
সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন অব্যাহত থাকার পর ১৯৮৯ সালে আয়োজিত হয় বহুল কাঙ্ক্ষিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন। উক্ত নির্বাচনে রুহুল কবির রিজভী সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। রাকসুর ভিপি হিসেবে তাঁর মেয়াদের সঙ্গেই যুক্ত ছিল ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান, যার মাধ্যমে সামরিক শাসনের পতন ঘটে এবং দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
রাকসুর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করার পর রিজভী জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে প্রবেশ করেন। ১৯৯২ সালের ১৬ জুন আয়োজিত ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে তিনি প্রত্যক্ষ ভোটাভুটির মাধ্যমে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাংগঠনিক ইতিহাসে প্রত্যক্ষ ব্যালটের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা করে কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচনের এই ঘটনাটি ছিল প্রথম ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক মাইলফলক।
কেন্দ্রীয় সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের সাংগঠনিক পরিকাঠামো পুনর্গঠন ও প্রসার ঘটাতে সমর্থ হন। এই সময়কালে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নেতৃত্বকে মূল দলের সমন্বিত রাজনৈতিক ধারার সাথে যুক্ত করার একটি সাংগঠনিক কৌশল প্রবর্তিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে বিএনপির জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে।
ছাত্ররাজনীতি শেষ করে মূল দলীয় রাজনীতিতে পদার্পণ করার পর রুহুল কবির রিজভী বিএনপি কেন্দ্রীয় কাঠামোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বে অন্তর্ভুক্ত হন। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তাঁকে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে মনোনীত করা হয়। একই সাথে তিনি দলের অফিসিয়াল মুখপাত্র ও দপ্তর পরিচালনার দায়িত্বও লাভ করেন।
ক্ষমতাসীন দলের চাপ ও তীব্র রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যখন বিএনপি একাধিক রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়, তখন ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় আগলে রাখার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা সুপরিচিত লাভ করে।
একাধিক মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেও তিনি টানা দুই মাসেরও বেশি সময় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় অবস্থান করে প্রতিদিনকার প্রেস ব্রিফিং ও সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন। এই ধারাবাহিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি মাঠপর্যায়ের কর্মী ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে দলের রাজনৈতিক বার্তা তুলে ধরতেন।
রাজনীতিতে তাঁর এই অবিচল উপস্থিতি ও অসংখ্য মামলার বিপরীতে রাজপথে সোচ্চার ভূমিকা তাঁকে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শিবিরে সংহত প্রতিরোধ ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি যখন দলীয় সমন্বয় ও নির্বাচন পরিচালনার কৌশল গ্রহণ করে, তখন রিজভীকে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব দেয়া হয়। জাতীয় নির্বাচনে দলের বিজয়ের পর গঠিত সরকারে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়, যেখানে তিনি পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদা লাভ করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ ও সাংগঠনিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট তাঁকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’র সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়।
পরবর্তীতে, বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে উক্ত দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এই শূন্যতার প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট বিএনপি স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার চত্বর থেকে শুরু হওয়া রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবন নয়াপল্টনের অবরুদ্ধ দপ্তর পেরিয়ে রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণী ক্ষেত্র ও দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব পদ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। মাঠপর্যায়ের রাজপথের সংগ্রাম থেকে নীতি-নির্ধারণী পদে তাঁর এই উত্তরণ প্রমাণ করে যে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা, সাংগঠনিক ত্যাগ এবং রাজনৈতিক সংকটের মুখে অবিচল অবস্থানই একজন রাজনৈতিক কর্মীকে জাতীয় নেতৃত্বের শীর্ষে পৌঁছে দিতে পারে।
তাঁর মহাসচিব পদে পদার্পণ বিএনপির অভ্যন্তরীণ পদোন্নতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা উদীয়মান নেতাদের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হয়।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক ।