সম্পাদকীয়

৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরানোর আশ্বাস ও রাখাইনের বাস্তবতা: কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, চাই টেকসই প্রত্যাবাসন

দীর্ঘ নয় বছরে পদার্পণ করতে যাওয়া রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারের সেনাসমর্থিত সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণা এক নতুন কূটনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজারেরও বেশি শরণার্থীর তালিকার মধ্য থেকে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে প্রমাণিত প্রায় ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রোহিঙ্গাকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফেরত নিতে তারা ইচ্ছুক।

প্রথম দর্শনে এটি একটি ইতিবাচক বার্তা মনে হলেও, গত ৯ বছরের ইতিহাস, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং রাখাইন রাজ্যের বাস্তব চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ ধরনের প্রতিশ্রুতি কেবল শর্তযুক্ত প্রতিশ্রুতির গোলকধাঁধায় আটকে থাকার ঝুঁকি তৈরি করে।

২০১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও স্থানীয় মিলিশিয়াদের বর্বরোচিত গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের মুখে ৮ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নতুন করে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ইতিপূর্বেও একাধিকবার প্রত্যাবাসন চুক্তি ও কাঠামো তৈরি হলেও সামরিক অভ্যুত্থান, নাগরিকত্ব না দেওয়া এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তার অভাবে একটি রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে ৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরানোর মিয়ানমারি প্রস্তাবে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও জটিল বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি। মিয়ানমার সরকার প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে শর্ত হিসেবে রাখাইন রাজ্যের “নিরাপত্তা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা”র কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু বর্তমানে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ কেবল জান্তা সরকারের হাতে নেই; বরং সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে তীব্র যুদ্ধের কারণে পুরো রাখাইন অঞ্চল এখন অস্থিতিশীল। পরিস্থিতি কখন এবং কীভাবে “স্থিতিশীল” হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় এই প্রতিশ্রুতি অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলন্ত থাকার আশঙ্কা তৈরি করে।

মিয়ানমার ঐতিহ্যগতভাবেই রোহিঙ্গাদের নিজস্ব ১৩৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত না করে ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে আসছে। নাগরিকত্ব, ভিটেমাটি ফেরত পাওয়া এবং মৌলিক মানবাধিকারের স্পষ্ট গ্যারান্টি ছাড়া রোহিঙ্গারা নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী রাখাইনে ফিরতে সম্মত হবে না। নাগরিকত্ব ছাড়া ফেরত পাঠানো হলে তা আবারও কোনো না কোনো সময়ে একই ধরনের বাস্তুচ্যুতির জন্ম দেবে।

মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে যাচাই-বাছাই করা ৩ লাখের বাইরেও ১ লাখের বেশি তালিকা বাতিল বা প্রক্রিয়াহীন রাখা হয়েছে। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ করতে এবং রোহিঙ্গা শিবিরে চলা মানবিক সহায়তার সংকট দূর করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ ও আসিয়ানের সরাসরি অংশগ্রহণ জরুরি। মালয়েশিয়ার মতো আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে মিয়ানমারের আলোচনার পর বাংলাদেশেরও উচিত ত্রিপক্ষীয় ও বহুযোগাযোগভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফ্রেমওয়ার্ক জোরদার করা।

প্রায় ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বহু বছর ধরে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চরম চাপের মুখোমুখি। মিয়ানমার সরকারের ৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার ইচ্ছাকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি বিশ্ব সম্প্রদায়কে নিশ্চিত করতে হবে যে এই প্রত্যাবাসন যেন কেবল কাগজে-কলমে বা ফাঁকা প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ না থাকে। সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ, নিরাপদ পরিবেশ এবং পূর্ণ নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করাই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের একমাত্র পথ।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাস্ট্রচিন্তক।

Related News

সংলাপ ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা – রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান

প্রধানমন্ত্রীর আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান নিয়ে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসানের বিশ্লেষণধর্মী কলাম।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ফেনী সফর; উন্নয়ন, আবেগ ও সুশাসনের চিত্র : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সফর, কৃষক কার্ড বিতরণ, মহুরী সেচ প্রকল্প ও ১০০ শয্যার হাসপাতাল ঘোষণা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

জননিরাপত্তা, রাজনৈতিক শৃঙ্খলার পরীক্ষা ও সরকারের দায়বদ্ধতা : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, সরকারের বিব্রতবোধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ বেঁধে দেওয়া ঠিক হবে না : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন, এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার বিধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্থায়ী রূপরেখা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

খেলাপি ঋণের পাহাড় ও ব্যাংকিং খাতের সংকট: কাগজের শিথিলতা নয়, চাই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি

বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ও সংকটাপন্ন ঋণের সর্বশেষ চিত্র, কাঠামোগত ত্রুটি এবং ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনে চার দফা জরুরি সুপারিশ নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা অনুপ্রবেশকারী ও অপশক্তির ষড়যন্ত্র : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিও ভাঙচুর, হাইব্রিড নেতাদের অপতৎপরতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর বার্তা নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

চুয়েট উপাচার্য নিয়োগ বিতর্ক ও সংকট : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান

চুয়েট উপাচার্য অপসারণ, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, নতুন ভিসির অনলাইনে যোগদান ও শিক্ষাঙ্গনের অচলাবস্থা নিরসনে করণীয় নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ: বৈশ্বিক মঞ্চে সুশাসন, শান্তি ও টেকসই প্রগতির দৃপ্ত বার্তা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, জলবায়ু তহবিল, রোহিঙ্গা সংকট ও বিশ্বশান্তির ওপর বিশেষ সম্পাদকীয়।

Search