বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের সংকট ও টেকসই সমাধানের পথ : রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান
বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বক্তব্য, দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট, ক্যাপাসিটি চার্জ ও সমাধান নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয়।
দীর্ঘ নয় বছরে পদার্পণ করতে যাওয়া রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারের সেনাসমর্থিত সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণা এক নতুন কূটনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজারেরও বেশি শরণার্থীর তালিকার মধ্য থেকে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে প্রমাণিত প্রায় ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রোহিঙ্গাকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফেরত নিতে তারা ইচ্ছুক।
প্রথম দর্শনে এটি একটি ইতিবাচক বার্তা মনে হলেও, গত ৯ বছরের ইতিহাস, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং রাখাইন রাজ্যের বাস্তব চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ ধরনের প্রতিশ্রুতি কেবল শর্তযুক্ত প্রতিশ্রুতির গোলকধাঁধায় আটকে থাকার ঝুঁকি তৈরি করে।
২০১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও স্থানীয় মিলিশিয়াদের বর্বরোচিত গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের মুখে ৮ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নতুন করে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ইতিপূর্বেও একাধিকবার প্রত্যাবাসন চুক্তি ও কাঠামো তৈরি হলেও সামরিক অভ্যুত্থান, নাগরিকত্ব না দেওয়া এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তার অভাবে একটি রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে ৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরানোর মিয়ানমারি প্রস্তাবে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও জটিল বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি। মিয়ানমার সরকার প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে শর্ত হিসেবে রাখাইন রাজ্যের “নিরাপত্তা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা”র কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু বর্তমানে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ কেবল জান্তা সরকারের হাতে নেই; বরং সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে তীব্র যুদ্ধের কারণে পুরো রাখাইন অঞ্চল এখন অস্থিতিশীল। পরিস্থিতি কখন এবং কীভাবে “স্থিতিশীল” হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় এই প্রতিশ্রুতি অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলন্ত থাকার আশঙ্কা তৈরি করে।
মিয়ানমার ঐতিহ্যগতভাবেই রোহিঙ্গাদের নিজস্ব ১৩৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত না করে ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে আসছে। নাগরিকত্ব, ভিটেমাটি ফেরত পাওয়া এবং মৌলিক মানবাধিকারের স্পষ্ট গ্যারান্টি ছাড়া রোহিঙ্গারা নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী রাখাইনে ফিরতে সম্মত হবে না। নাগরিকত্ব ছাড়া ফেরত পাঠানো হলে তা আবারও কোনো না কোনো সময়ে একই ধরনের বাস্তুচ্যুতির জন্ম দেবে।
মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে যাচাই-বাছাই করা ৩ লাখের বাইরেও ১ লাখের বেশি তালিকা বাতিল বা প্রক্রিয়াহীন রাখা হয়েছে। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ করতে এবং রোহিঙ্গা শিবিরে চলা মানবিক সহায়তার সংকট দূর করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ ও আসিয়ানের সরাসরি অংশগ্রহণ জরুরি। মালয়েশিয়ার মতো আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে মিয়ানমারের আলোচনার পর বাংলাদেশেরও উচিত ত্রিপক্ষীয় ও বহুযোগাযোগভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফ্রেমওয়ার্ক জোরদার করা।
প্রায় ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বহু বছর ধরে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চরম চাপের মুখোমুখি। মিয়ানমার সরকারের ৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার ইচ্ছাকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি বিশ্ব সম্প্রদায়কে নিশ্চিত করতে হবে যে এই প্রত্যাবাসন যেন কেবল কাগজে-কলমে বা ফাঁকা প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ না থাকে। সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ, নিরাপদ পরিবেশ এবং পূর্ণ নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করাই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের একমাত্র পথ।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাস্ট্রচিন্তক।