একটি জাতির ভবিষ্যৎ বুনিয়াদ গড়ে ওঠে তার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মানের ওপর। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের সাম্প্রতিক ঘোষণা বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কৌশলগত রূপান্তর এবং বাস্তবমুখী সংস্কারের এক নতুন আশার বার্তা বহন করে। ময়মনসিংহে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমিতে (নেপ) আয়োজিত কর্মশালায় প্রতিমন্ত্রী স্পিকিং টেস্ট চালুর পরিকল্পনা, সমন্বিত আইটি ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে ইউনিক আইডি প্রদান, স্কুল ভবনে আধুনিক ওয়াশ ব্লক নির্মাণ এবং পুষ্টিকর মিড-ডে মিল ও শিক্ষা উপকরণ সুনিশ্চিত করার যে রূপরেখা প্রকাশ করেছেন—তা যুগোপযোগী এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সংগতিপূর্ণ।
ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ইংরেজি শিক্ষা মূলত লিখিত ও ব্যাকরণনির্ভর হওয়ায় শিক্ষার্থীরা যোগাযোগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শেখানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে স্পিকিং টেস্ট চালু করার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত দূরদর্শী। এটি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।
প্রাথমিক শিক্ষার এই নতুন রূপরেখায় কয়েকটি মূল দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যবহারিক ইংরেজি বলার চর্চা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক সমন্বিত আইটি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার উদ্যোগ শিক্ষার মান বহুলাংশে বৃদ্ধি করবে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ‘ইউনিক আইডি’ নিশ্চিত করা হলে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের একাডেমিক তথ্য ব্যবস্থাপনা, মনিটরিং ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত সহজতর হবে।
স্কুলের বাইরে পৃথক ওয়াশ ব্লকের বদলে ভবনের ভেতরে নিরাপদ ও আধুনিক ওয়াশ ব্লক স্থাপন এবং পুষ্টিকর মিড-ডে মিল, জুতা, ব্যাগ ও ফ্রি ইউনিফর্ম প্রদানের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করবে। পুষ্টি ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ শিখন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।
প্রতিমন্ত্রী যেভাবে মসজিদ ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তুলনামূলক উদাহরণ টেনে স্থানীয়দের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান মনে করার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন, তা এক গভীর সামাজিক বাস্তবতাকে নির্দেশ করে। বিদ্যালয়কে কেবল সরকারের সম্পত্তি না ভেবে অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় সমাজের যৌথ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার মানসিকতা তৈরি হলে স্কুলের সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ বহুগুণে উন্নত হবে।
আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষকদের যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ, শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালার আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে প্রাথমিক শিক্ষা রূপান্তরের এই রূপরেখা কেবল কাগজ-কলমে থাকবে না। একটি আলোকিত ও দক্ষ নতুন প্রজন্ম গড়ার লক্ষ্যে সরকারের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপে সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক সহযোগিতা কাম্য।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাস্ট্রচিন্তক।