বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুপরিচিত ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় রাজনীতির মাঠে নানা প্রতিকূলতা, কারাবাস ও আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অন্যতম শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও প্রধান মুখপাত্র হিসেবে তিনি দলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন।
অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদের পৈতৃক নিবাস কুড়িগ্রাম জেলায় হলেও তিনি জন্মগ্রহন করেন ঢাকায়, ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। তাঁর শিক্ষাজীবন কেটেছে দেশের বেশ কয়েকটি খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, বগুড়া জিলা স্কুল এবং বগুড়া বাংলা স্কুলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে তিনি পড়াশোনা করেন। এরপর উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক শিক্ষার জন্য তিনি রাজশাহী অঞ্চলোন্তরিত হন।
রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা এবং ইতিহাস—দুটি ভিন্ন বিষয়ে স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিধি বাড়িয়ে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক (এলএলবি) ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে পেশাগত জীবনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয় শিক্ষাজীবনের শুরুতে ছাত্রাবস্থায়। প্রথমে তিনি বামপন্থী ছাত্র রাজনীতি ধারা—’বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন’-এর সাথে যুক্ত হন এবং বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন রাজশাহী সরকারি কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী ধারার রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগদান করেন। ছাত্রদলের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ও পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক ও পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বর্ণাঢ্য ছাত্ররাজনীতির সবচেয়ে বড় মাইলফলক অর্জিত হয় *৯৮৯ সালে, যখন তিনি ঐতিহাসিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে থেকে তৎকালীন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজকে নেতৃত্ব দেন।
ছাত্ররাজনীতির পাট চুকিয়ে মূলধারার জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন রিজভী। দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমায় তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় দপ্তরে সুদীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত বিশ্বস্ততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। দলের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে ও সংকটময় পরিস্থিতিতে তিনি নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও দলের অবস্থান জাতির সামনে তুলে ধরেছেন, যার ফলে তিনি দলের প্রধান ‘মুখপাত্র’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
২০১৬ সালের ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। দীর্ঘ ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৫ই আগস্ট ২০২৬ দলের সহদপ্তর সম্পাদক মুহাম্মদ মুনির হোসেনের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে তাঁকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী কেবল একটি রাজনৈতিক দলের পদধারী নেতাই নন, বরং তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক পরিচিত মুখ। শত দমনপীড়ন, কারাবাস ও শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও দলীয় আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে তিনি মাঠে টিকে ছিলেন। শিক্ষা, আইন পেশা এবং আপসহীন রাজনৈতিক সংগ্রাম—এই তিনের মেলবন্ধনে তাঁর জীবন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
লেখক: আফরোজা বেগম জলি, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা মহিলা দল চট্টগ্রাম মহানগর জাসাসের সক্রিয় নেত্রী ও সাবেক উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান।